হাম কমাতে চাই আরও ২৫ শতাংশ টিকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকার বলেছিল, জুন নাগাদ হাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু প্রাদুর্ভাব শুরুর পাঁচ মাস পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত। সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সবকিছু ঠিকঠাকভাবে করা গেলে হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই-তিন মাস সময় লাগতে পারে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে সহসাই হাম কমার সম্ভাবনা নেই। টিকাদানযোগ্য শিশুদের অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকার আওতায় না আসা পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাব চলতেই থাকবে। অর্থাৎ কম-বেশি যে ৩০ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্তত ২৫ শতাংশকে টিকা না দেওয়া পর্যন্ত থামবে না হাম সংক্রমণের গতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন হামের টিকার কাভারেজ অপর্যাপ্ত থাকায় দেশে ইমিউনিটি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হামের ঝুঁকিতে। ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা কম থাকায় বস্তি, দুর্গম এলাকা, ভাসমান জনগোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকা পরিবারগুলোতে কাভারেজ কম হয়েছে। সচেতনতার অভাবেও টিকাবঞ্চিত অনেকে। আক্রান্ত হওয়ার পরও অনেকে আইসোলেশনে না যাওয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে। পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধপানের হার কমে যাওয়ায় মাতৃপ্রতিরোধক্ষমতা কমেছে। অপুষ্টিও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মোটামুটি এ ছয় কারণেই হাম ছড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৮৮ জন। মারা গেছে ৯৬০ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৭০ এবং মারা গেছে ৫ জন। ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত হাম-রুবেলা জাতীয় ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা দেওয়ার দাবি সরকারের। তবে জুনের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ লাখ শিশু কম। উভয়ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশু। এখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান চলছে। নতুন করে ১৫-১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ বলেছেন, এতে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন সম্ভব হবে না। সঠিক প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হিসাবেও গলদ রয়েছে। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকবে।
হামের টিকার কাভারেজ এখনো পর্যাপ্ত নয় জানিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত আগামীর সময়কে বলেছেন, বাদ পড়া ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এতে ৯৫ শতাংশ কাভারেজ হবে না; আরও কমপক্ষে ১০ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে।
কথা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ইউনিসেফের অদক্ষতা ও অলসতায় কাভারেজ কম হয়েছে। তাই এ অবস্থা। প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি ঢাকার ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার রিয়াদ মাহমুদ।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা বলেছেন, ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া শিশুর হার ৩০ শতাংশের বেশি। ফলে আপাতত সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা নেই। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী বললেন, একমাত্র টিকাদানের মাধ্যমেই হাম ঠেকানো যায়। হার্ড ইমিউনিটির জন্য টিকা পাওয়ার কথা এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। কাভারেজ বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অ্যান্ড সার্ভিল্যান্সের সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ জানিয়েছেন, মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের শিশু সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে টিকার লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৮০ লাখ নির্ধারণ করা হয়। সেটি পর্যাপ্ত না হওয়ায় ঘাটতি পূরণে টিকাদান চলছে। সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি— এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেছেন, হাতে পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় এবং নতুন টিকা কেনার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় হিসাব করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এতে হার্ড ইমিউনিটি আসবে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, আসতে পারে।
তবে ইপিআইয়ের আরেক কর্মকর্তা বললেন, এতে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন সম্ভব নয়। বিগত কয়েক বছর টিকার কাভারেজ কম থাকায় বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা অনেক। এ ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হাম নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা কম। দেশে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যাও বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার শতভাগ সাফল্য দাবি করলেও চলতি বছরের হামের ক্যাম্পেইনে টিকার কাভারেজ ৭০ শতাংশের কম। তবে দায়িত্বশীল কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাদ পড়া শিশুর হার ৩০ শতাংশ কি না, জানতে চাইলে আইইডিসিআর পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী বললেন, এই হিসাবও গবেষণা করে যাচাই করা দরকার। প্রতিদিন নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে এবং অনেকে ছয় মাসের বয়সসীমায় প্রবেশ করছে। এসব বিবেচনায় নিয়েই টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। সরকারি-বেসরকারি জরিপে পার্থক্য থাকায় বাদ পড়া শিশুর সঠিক সংখ্যা জানতে নির্ভুল জরিপ প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ বলেছেন, সরকার হামকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। টিকাদানযোগ্য শিশুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বারবার ভুল হচ্ছে। প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিও সংক্রমণ বাড়াচ্ছে।
দেশের কোন কোন এলাকা হামের বেশি ঝুঁকিতে জানতে তথ্য চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিনটি বিভাগে যোগাযোগ করেন এ প্রতিবেদক। এক বিভাগ অন্য বিভাগে পাঠালেও শেষ পর্যন্ত কেউ তথ্য দেয়নি। আইইডিসিআর পরিচালক জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) পাঠানো হয়েছে। এমআইএসের কন্ট্রোল রুম থেকে ইপিআই ভবনে এবং ইপিআই থেকে আবার এমআইএসে যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে এমআইএসের এক কর্মকর্তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, তথ্য লুকোচুরি করে হাম প্রতিরোধ করা যাবে না। সঠিক লক্ষ্যমাত্রায় টিকা দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দিতে হবে। মৃত্যুঝুঁকি কমাতে কমিউনিটিতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
গত ১২ আগস্ট জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) জানিয়েছে, কয়েকটি ভৌগোলিক এলাকা ও বয়সভিত্তিক গোষ্ঠীতে সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। তারা ৬-৫৯ মাস বয়সী বাদ পড়া শিশুদের টিকাদান জোরদার এবং মহামারী বিদ্যাগত তথ্যের ভিত্তিতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৫-১৪ বছর বয়সীদের টিকার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত শিশু এবং এ রোগে মৃত্যুর পেছনে ছয় মাস পর্যন্ত পরিপূর্ণ বুকের দুধ না পাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআর,বি’র যৌথ গবেষণায় হামে আক্রান্ত ও চিকিৎসা নেওয়া ৩৫৪ জন শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়— হামে আক্রান্ত শিশুর ৩৮ শতাংশ শিশু জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পায়নি। সবচেয়ে বেশি (৪৩ শতাংশ) আক্রান্ত হয়েছে ৩ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা। হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশই ছয় মাস পর্যন্ত পরিপূরক ছাড়া শুধু বুকের দুধ পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিটি) কম থাকার কারণেই মূলত কম বয়সী শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে পাওয়া ইমিউনিটির কারণে ছয় মাসের কম বয়সীদের সুরক্ষিত থাকার কথা ছিল। তবে সচেতনতার অভাবে কিংবা শখ করে শিশুকে ফর্মুলা দুধ ও বাইরের খাবার খাওয়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এমআইসিএস ২০২৫-এর সরকারি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পাশাপাশি জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।







