ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায় বিডব্লিউজিইডি

নির্মাণাধীন নর্থ ঢাকা বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প
ঢাকার আমিনবাজারে নির্মাণাধীন নর্থ ঢাকা বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি ব্যয়বহুল এবং পরিবেশগতভাবে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। ৪২.৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের নানান ক্ষতিকর ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর আবেদন জমা দিয়েছে সংগঠনটি।
আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে প্রকল্পটি। ২০২০ সালে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও সিএমইসির মধ্যে চুক্তি সই হয়। কিন্তু সাড়ে চার বছরেও শুরু হয়নি প্রকল্পের নির্মাণকাজ।
এমন পরিস্থিতিতে এই প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়ে বিডব্লিউজিইডি বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যক্ষমতায় (পিএলএফ) চললে বছরে ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি ইউনিট ২১.৭৮ সেন্ট দরে (২৬.৭৯ টাকা) বিদ্যুৎ কিনবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। আর পিএলএফ ৪০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪৭ টাকা। কোনো কারণে পিএলএফ ২০ শতাংশে নেমে এলে বিদ্যুতের দাম দিতে হবে কমপক্ষে ৭৫ টাকা। এর ফলে বছরে নতুন ৫৮.৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সরকারের ঘাড়ের উপর পড়বে বলে উল্লেখ করা হয় আবেদনপত্রে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। অর্থাৎ প্রতি মেগাওয়াটে খরচ হবে ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচের প্রায় আড়াই গুণ (প্রতি মেগাওয়াট ৪৭ কোটি টাকা)।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বললেন, ‘এ পরিমাণ টাকা দিয়ে ৪২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যেত, যেখান থেকে কোনো জ্বালানি ছাড়াই বছরে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারতো।’
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার (১,২৩০ কোটি টাকা), নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন (১,২৩০ কোটি টাকা) ডলার ঋণ দিচ্ছে। সিএমইসি বিনিয়োগ করছে ১৫৭ মিলিয়ন (১,৯৩১ কোটি টাকা) ডলার। বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার (১,৩৫৩ কোটি টাকা) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে তা উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
তারা বলছে, এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করবে। কোনো কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না হয় তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার (৬,১৫০ টাকা) জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য তৈরি হয়। কেন্দ্রটি চালু হলে সিটি করপোরেশনে আরো বেশি বর্জ্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ফলে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের বদলে ঢাকাবাসীকে নোংরা জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে এ প্রকল্প।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯.৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারী ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১.১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যান্সার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বাড়াবে।
সংগঠনটির দাবি, এই প্রকল্পের ফলে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদুষণ কমবে বলা হলেও বাস্তবে হবে উল্টো। এখান থেকে বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১.৩ থেকে ১.৮ কেজি কার্বন নির্গমন হবে, যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিনগুণ। পূর্ণমাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ-বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি ভূক্তভোগী হবে নগরবাসী।
এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের (এআইআইবি) পরিবেশগত ও সামাজিক নীতি (ইএসএফ) অনুসারে প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনসাধারণের স্বাধীন মতামত গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) অনুসারে স্থানীয় শতাধিক মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ বলেছেন যে, তাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। এছাড়া যাদের কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে মতামত জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তাও করা হয়েছে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর।
এআইআইবির পরিবেশ ও সামাজিক নীতিমালা অনুসারে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকল্পে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছে বিডব্লিউজিইডি।
বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় ১ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে বর্জ্য পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু গত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শুধুমাত্র সিএমইসির স্বার্থে রাষ্ট্রীয় আইন সংশোধন করে ৮৫০ ডিগ্রি অনুমোদন করার প্রস্তাব দিয়েছে।
হাসান মেহেদী বলছিলেন, ‘একটি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার মানদণ্ড শিথিল করার উদ্যোগ আইনের শাসন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।’
বিডব্লিউজিইডি বলছে, নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু একটি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই প্রকল্পটি বাতিল করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন, জৈবসার উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিকল্প কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।




