বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
কর্মক্ষমদের কাজ দিতে পারছে না বাংলাদেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু ধীরগতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রম খাতে নারীদের কম অংশগ্রহণ ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে নেওয়া যাচ্ছে না অনুকূল জনমিতির সুবিধা। এতে ব্যর্থ হচ্ছে উচ্চ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও প্রবৃদ্ধি অর্জন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনটি।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। তখন বাংলাদেশ ‘বয়স্ক সমাজে’ পরিণত হবে। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় সীমিত হলেও কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো দুর্বল। ফলে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে দেশ।
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন বা জনমিতিক পরিবর্তনের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাংলাদেশ সময় পাবে প্রায় দুই দশক। কিন্তু যথেষ্ট কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিকদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় তৈরি করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে বয়স্ক জনসংখ্যার চাপ সামলাতে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা আবশ্যক।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো অনুকূল জনসংখ্যা বিন্যাসকে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধিতে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই কাজ করছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে, যাদের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এমনকি স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তির ৬০ শতাংশের বেশি আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে বাধ্য হচ্ছেন অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে। এসব কাজে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫-৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা নিয়েও মানসম্মত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না বিপুলসংখ্যক মানুষ।
দেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার গড়ের অর্ধেক। শ্রম-উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হারও কম। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কমাচ্ছে কর্মীর সংখ্যা।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের চেয়ে শ্রমের জোগান ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন হবে।
একদিকে, আনুষ্ঠানিক খাতে অত্যন্ত ধীরগতিতে কর্মসংস্থান তৈরি করছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে কমেছে শ্রমিকসংখ্যা। এমনকি উচ্চশিক্ষাও আনুষ্ঠানিক খাতে দিতে পারছে না কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। শ্রম খাতে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা-দক্ষতার ধারাবাহিক ঘাটতি দেশের এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা নেওয়ার সক্ষমতাকে আরও সীমিত করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। সরকারি বয়স্ক ভাতা মাসে ৫০০ টাকা। দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের তুলনায় এই ভাতা ৫ থেকে ৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য উল্লেখযোগ্য পেনশন কর্মসূচি নেই।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক সুযোগ নির্ভর করছে দেশটি এখন কী ধরনের কর্মসূচি নিচ্ছে তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালো মানের কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করা, তরুণদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় রূপান্তর এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসার পথের বাধাগুলো দূর করা।’
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বললেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি উন্নয়নের তুলনায় দ্রুত এবং আগেই বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন।



