দিল্লির আরবান ভিলেজগুলো কেন অগ্নিকাণ্ডে মরণফাঁদ

৩ জুন আগুন লাগে দিল্লির মালভিয়া নগরের এই ভবনটিতে- হিন্দুস্তান টাইমস
ভারতের রাজধানী দিল্লির অন্যতম নামকরা চিকিৎসাকেন্দ্র ‘ম্যাক্স হসপিটালের’ অদূরে দক্ষিণ দিল্লির সাকেত অঞ্চলের মালভিয়া নগরের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে ঘটা এই দুর্ঘটনার পর দিল্লির অভ্যন্তরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গজিয়ে ওঠা ‘আরবান ভিলেজ’ বা শহুরে গ্রামগুলোর আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জানানো হয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছে। এ ছাড়া আরও ছয়জন বাংলাদেশি গুরুতর দগ্ধ বা আহত অবস্থায় অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর থেকে এখনো তিন বাংলাদেশি নিখোঁজ।
চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় দুই থেকে তিনশ বাংলাদেশি এই ম্যাক্স হাসপাতালে আসেন। কম খরচে থাকার জন্য তারা সাধারণত সংলগ্ন এই হজ রানি বা মালভিয়া নগর অঞ্চলের তুলনামূলক সস্তার আবাসিক হোটেলগুলোয় অবস্থান করেন।
দিল্লি পুলিশ ও ফায়ার ডিপার্টমেন্টের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভবনের বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই মূলত আগুনের সূত্রপাত হয়। যেখানে প্রথম আগুন লাগে সেখানে বেশ কয়েকটি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ রাখা ছিল এবং তার মধ্যে একটি সিলিন্ডারে প্রচণ্ড শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটায় আগুন মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এই ঘটনায় ব্যাপক অনিয়ম ও গাফিলতির প্রমাণ পেয়ে দিল্লি পুলিশ বুধবার রাতেই হোটেলের মালিক লবকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করেছে।
দমকল বাহিনীর কর্মকর্তারা তদন্তে জানতে পেরেছেন, ওই ভবনটিতে মাত্র ছয়টি ঘর পরিচালনার আইনি অনুমতি থাকলেও মালিকপক্ষ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে সেখানে ২৬টি ঘর তৈরি করে ব্যবসা চালাচ্ছিল। এ বিষয়ে দিল্লি পুলিশের এক তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাজাজকে এই চরম অনিয়মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অত্যন্ত উদাসীনভাবে উত্তর দেন, ‘দিল্লিতে তো সবই চলে।’
দিল্লির চিফ ফায়ার অফিসার অভিলাষ মালিক উদ্ধারকাজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে জানান, হোটেল কর্তৃপক্ষ ফায়ার ডিপার্টমেন্ট থেকে কোনো প্রকার অগ্নি নিরাপত্তা ছাড়পত্র বা এনওসি সংগ্রহ করেনি। এমনকি পর্যটন বিভাগ থেকে শুধু ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ লাইসেন্স নিয়ে তারা এই বহুতল ভবনটি চালাচ্ছিল। ভবনটির গঠনগত ত্রুটির কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ভবনটিতে একটি বেসমেন্ট, একটি গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং তার ওপরে পাঁচটি তলা রয়েছে। ভবনটির কাঠামোর কারণে আগুন নেভানো এবং লোকজনকে উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। ভেতরের জানালাগুলো স্থায়ীভাবে সিল করা ছিল এবং কোনো বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না।
এই ধরনের ভবনগুলো খাদের মতো কাজ করে। আগুন লাগার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভবনটি তীব্র তাপ ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভরে যায়, যার ফলে ভেতরে থাকা মানুষদের পালানোর প্রায় কোনো সুযোগই ছিল না।’ গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, সকাল পৌনে এগারোটার পরও ভবন থেকে ধোঁয়াচ্ছন্ন অবস্থায় মানুষকে উদ্ধার করা হচ্ছে। কয়েকজন নিরুপায় হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ওপর থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ছেন।
দিল্লির মুনিরকা, শাহপুর জাট, হজ রানি কিংবা খিড়কি এক্সটেনশনের মতো ‘আরবান ভিলেজ’ বা পুরনো গ্রামগুলো মূলত শহর সম্প্রসারণের ফলে ঘিঞ্জি বসতি, সরু রাস্তা ও গাদাগাদি করা বহুতল ভবনে রূপ নিয়েছে। যেখানে আগুন নেভানো বা উদ্ধারকাজ চালানো দমকলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হজ রানি অঞ্চলের বহু রাস্তা এতটাই সরু যে সেখানে তিনজন মানুষও পাশাপাশি চলতে পারেন না। অথচ তার দুপাশে বহুতল ইমারত গড়ে তোলা হয়েছে।
নিজের পরিবারের চিকিৎসার জন্য এসে পাশের একটি হোটেলে অবস্থান করা মার্কিন নাগরিক মাইকেল তার নিখোঁজ আফ্রিকান-আমেরিকান বন্ধুদের কথা উল্লেখ করে আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, ‘ভবনটি আগুনে পুড়ছিল এবং আমি অনেককে ওপর থেকে লাফাতে দেখেছি। সেখানে ঢোকা ও বেরোনোর মাত্র একটি পথ ছিল। বের হওয়ার অন্য কোনো উপায় ছিল না। আমি বিশ্বাস করি, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির সবচেয়ে বড় কারণ হলো ঢোকা ও বেরোনোর একটিমাত্র পথ।’
ঘটনার পর স্থানীয় মানুষই প্রথম উদ্ধারকাজে এগিয়ে এসেছিলেন। ম্যাক্স হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ওয়াসিম রাজা তার বন্ধুদের নিয়ে উদ্ধারকাজের কঠিন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে জানান, হোটেলের প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল, যা লোহার কাটার দিয়ে কাটতে হয়েছিল এবং বেরোনোর পথ বন্ধ থাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছাতে তাদের চরম বেগ পেতে হয়েছে।







