বিদ্যুৎ-জ্বালানির ৯ প্রতিষ্ঠানে ধার করা প্রধান
- তোড়জোড় শুধু জোড়াতালিতে
- অতিরিক্ত সচিবরা শীর্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে
- দাপ্তরিক কাজে মন্থরতার পাশাপাশি ব্যাহত উন্নয়ন

ফাইল ছবি
ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে দেশ। বাসাবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা— সবখানেই গ্যাসের হাহাকার। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও নাজুক। এমন সংকটকালেও নেতৃত্বহীন এ খাতের ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। স্থায়ী দূরদর্শী নেতৃত্বের বদলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে ‘ধার করা’ লোক দিয়ে। শীর্ষ পদগুলোতে বসানো হয়েছে আমলাদের। কাউকে দেওয়া হয়েছে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’, কাউকে ‘চলতি দায়িত্ব’। এমন জোড়াতালির নেতৃত্বে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো খাত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত বা চলতি দায়িত্বে থাকাদের নীতিগত বা দীর্ঘমেয়াদি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশাসনিক ও আইনি এখতিয়ার থাকে সীমিত। স্থায়ী পদে না থাকায় সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঝুঁকি নিয়ে বড় কোনো ফাইল সই বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে চান না। এ ছাড়া অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা নিজ নিজ মূল পদের কাজ সামলে আবার বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ায় কার্যক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই যায় কমে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনসহ (পেট্রোবাংলা) বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ৯টি প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদ রয়েছে শূন্য। শীর্ষ এসব পদে ধার করা লোক দিয়ে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে কার্যক্রম। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বেশিরভাগই অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন সরকারের অতিরিক্ত সচিবরা। এতে দাপ্তরিক কাজে জটিলতার পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানি খাতের উন্নয়নও।
কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় পুরোটা সময়ই বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। দৈনন্দিন কিছু কাজ ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে। সিদ্ধান্তহীনতা আর দীর্ঘসূত্রতায় আটকে ছিল সবকিছু। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কিছুটা গতি ফিরলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে স্থায়ী নিয়োগ না দেওয়ায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত আর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এ খাতে এক ধরনের টালমাটাল অবস্থা চলছে।
জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। দেশের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, উন্নয়ন এবং বিপণনের কাজ করে সংস্থাটি। তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩টি। মাত্র তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান পদ থেকে এরফানুল হককে সরিয়ে গত মে মাসে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মান্নানকে।
প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলছিলেন, এখন ভয়াবহ জ্বালানি সংকট চলছে। যার প্রভাব বাসাবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা এমনকি বিদ্যুতেও। এমন পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলার মতো একটা প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চেয়ারম্যান খুবই দরকার। তা ছাড়া সরকার স্থলভাগে এবং সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে জোর দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের বাস্তবায়নে চেয়ারম্যানের রয়েছে বড় ভূমিকা। কিন্তু চেয়ারম্যানের পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে একজন অতিরিক্ত সচিব থাকায় সব কার্যক্রম এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি দৈনন্দিন কাজেও এক দিনের জায়গায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগছে কখনো কখনো।
আরেক কর্মকর্তা জানালেন, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত দায়িত্ব হওয়ায় আব্দুল মান্নান জ্বালানি বিভাগের নির্ধারিত কাজের জন্য বেশিরভাগ সময় থাকেন সচিবালয়ে। এতে দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তও থাকছে আটকে।
পেট্রোবাংলার অন্য এক কর্মকর্তার ভাষ্য, নিয়মিত দায়িত্বে থাকলে চেয়ারম্যানের কাজেও গতি থাকে। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি উদ্যোগী হয়ে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে নানান কাজও করেন।
কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন নিয়ে অনেকেরই আপত্তি আছে। চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে শুনানির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু প্রায় ছয় মাস ধরে এ কার্যক্রম বন্ধ বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ভৌগোলিক এলাকা বাদে খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুরসহ ২১টি জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে গত বছরের ২৮ আগস্ট নিয়োগ পান শেখ জাকিরুজ্জামান। তিন বছরের জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া হলেও মাত্র আট মাসের মাথায় বাতিল করা হয় তার চুক্তি। এরপর ওই পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য মো. আ. বাছিদকে। যদিও তিনি মাত্র এক সপ্তাহের মতো ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। সেখানে আবারও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় পিডিবির আরেক সদস্য আ ন ম ওবায়দুল্লাহকে।
ওজোপাডিকোর একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর খুলনায়। সেখানে প্রায় সার্বক্ষণিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের থাকার কথা থাকলেও ওবায়দুল্লাহ পিডিবির কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্বে থাকায় বেশিরভাগ সময় থাকেন রাজধানী ঢাকাতেই। ফলে ওজোপাডিকোর দাপ্তরিক ব্যাঘাত ঘটছে চরমভাবে। গুরুত্বপূর্ণ চরম নানান সিদ্ধান্তও আটকে যায় প্রায়ই।
ঢাকার একাংশ এবং নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। ১৬ মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের আমলারা।
নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে গত বছরের ২৩ মার্চ ইস্তফা দেন প্রকৌশলী আবদুল্লাহ নোমান। এক দিন পর ২৪ মার্চ সেখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পান বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমদ। গত ৬ মে তাকে সরিয়ে আরেক অতিরিক্ত সচিব হাবিবুন নাহারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হাইড্রোকার্বন ইউনিটের মহাপরিচলক পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন মো. সাবেদ আলী নামে এক যুগ্ম সচিব। দেশের তেল-গ্যাসের মজুদ ও সম্ভাব্য উৎস নিরূপণ এবং হালনাগাদকরণ, জ্বালানিসংক্রান্ত হালনাগাদ ডেটাবেজ তৈরি, উৎপাদন বণ্টন চুক্তি ও যৌথ উদ্যোগ চুক্তির বিষয়ে মতামত এবং জ্বালানির অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বাজার পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যুৎ খাতে সরকারি-বেসরকারি প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, সেমিনারসহ নানান গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিপিএমআই)। বিদ্যুৎ বিভাগের অধীন এই প্রতিষ্ঠানের রেক্টর পদটি শূন্য ১০ মাস ধরে। গত সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেন।
প্রতিষ্ঠানটির মেম্বার ডিরেক্টিং স্টাফ থেকে শুরু করে পরিচালকসহ অন্য যে সাতজন কর্মকর্তা রয়েছেন, তারাও সবাই অতিরিক্ত দায়িত্বে। বিদ্যুৎ বিভাগের অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের ধার করে এনে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চলছে।
জানতে চাইলে সবুর হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এসব পদে নিয়মিত বা স্থায়ী কাউকে দায়িত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো। রেক্টরসহ অন্যান্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, শিগগির স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হবে।’
বিপিএমআইর এক কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা আমাদের জন্যও ঝামেলার এবং কষ্টের। স্থায়ী নিয়োগ হলে কাজের সুযোগ অনেক বেশি থাকে।’
দেশের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, মানচিত্র তৈরি এবং গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার কাজ করে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর। সেখানেও মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন মো. রফিকুল আলম, যিনি সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব।
চলতি দায়িত্বে তিনজন: বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী মো. ইমাম উদ্দিন শেখ।
রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডে এস এম তারিকুল ইসলামও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চলতি দায়িত্বে আছেন প্রায় ছয় মাস। একইভাবে চৌধুরী মো. জিয়াউল হাসান পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, জবাবদিহির অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি একটি উচ্চ কারিগরি খাত। এখানে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া খুবই জরুরি। এজন্য একটা ক্রাইটেরিয়া (নীতিমালা) আছে। কিন্তু তারা (আমলারা) সব পারেন। কারণ, কোনোকিছু যদি করা না লাগে, তাহলে তো সব দপ্তরই সমান। আজকে যিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে আছেন কালকে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। এতেই প্রমাণ হয়, তারা আসলে কোনো কাজ করেন না। তাদের তো কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই।’
জবাবদিহির এমন ঘাটতি বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সর্বনাশ ডেকে আনছে বলেও সতর্ক করলেন শামসুল আলম।






