ছিল আগাম সতর্কতা, তারপরও পোশাকশিল্পে অস্থিরতা
- দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পাশাপাশি সামনে আসছে ‘সরষের মধ্যেই ভূত’
- বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চান বিশেষজ্ঞরা।
- শিল্প পুলিশপ্রধানের দাবি, সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছেন
- বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতির ভাষ্য, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুতি নেয়নি
- ডিসেম্বর ঘিরে শ্রমিক অসন্তোষের আগাম শঙ্কা জানিয়ে ১৮ অক্টোবরই সতর্ক করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
- পুলিশসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ ছিল প্রস্তুতি নেওয়ার, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

ছবি: আগামীর সময়
আগাম সতর্কবার্তা ছিল। পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে অবহিতও ছিল সরকারের শীর্ষ মহল। এ বিষয়ে গত ১৮ অক্টোবর পুলিশসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে বিধি বাম। এতকিছুর পরও সম্ভব হয়নি তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা ঠেকানো। শ্রমিক বিক্ষোভ, সংঘাত ও সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আগাম প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে। আগাম তথ্য থাকার পরও কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল? কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলো? এমন প্রশ্নের পাশাপাশি সামনে আসছে ‘সরষের মধ্যেই ভূত’ থাকার বিষয়টিও।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সতর্কবার্তার একটি অনুলিপি আগামীর সময়ের হাতে এসেছে, যা বিশ্লেষণে দেখা গেছে— স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তায় ডিসেম্বরকে ঘিরে পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে আন্দোলন-বিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি, গোয়েন্দা নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অথচ সেই সতর্কবার্তার পরও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-২ শাখা থেকে ১৮ অক্টোবর জারি করা চিঠিতে (স্মারক নম্বর: ৪৪.০০.০০০০.০০০.০৭৫.০৩.০০০৩.২৬.৯৯৪) সম্ভাব্য শ্রম অসন্তোষ মোকাবিলায় একাধিক করণীয় তুলে ধরা হয়। এতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি সামনে রেখে পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। চিঠিতে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো প্রণয়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বিভিন্ন সময়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধিত) আইন ২০২৬ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে।
আগামী ২০ ডিসেম্বর গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করে চিঠিতে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের প্রত্যাশা, মালিকপক্ষের অবস্থান এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের তৎপরতা থেকে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। এ কারণে আগেভাগেই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে শ্রম অসন্তোষের নামে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন আন্দোলন, কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ের তৎপরতার ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া ও অসন্তোষের কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশও ছিল ওই চিঠিতে। বিশেষ করে শ্রমিকদের অসন্তোষের পেছনে প্রকৃত দাবিদাওয়া, মজুরি নিয়ে অসন্তুষ্টি এবং আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের উসকানি থাকলে তা আগেই শনাক্ত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু আগাম সতর্কবার্তার পরও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গতকাল সোমবার বিকালে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলছিলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা ও সহিংস আন্দোলনের পেছনে ফ্যাসিবাদের সমর্থক ও সুযোগসন্ধানীদের ইন্ধন রয়েছে। আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত ধ্বংস করতে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে মুখোশধারী বহিরাগতদের এমন কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
আগাম সতর্কবার্তার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। তাদের কেউ কেউ সরষের মধ্যেই ভূত থাকার বিষয়টি তুলে ধরছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বললেন, ‘বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া উচিত। শিল্পকারখানা অচল হলে দেশ অচল হয়ে পড়বে। শিল্পের পরিবেশ রক্ষার জন্য সরকারের উচিত বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা। দায়িত্ব পালনে কারও অবহেলা পাওয়া গেলে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর সাহস না করে।’
গোয়েন্দা ও পুলিশি ব্যর্থতায় আন্দোলন, ভাঙচুর এবং হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বললেন, ‘তাদের কাছে তথ্য থাকলেও আগে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুতি নেননি। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী প্রবেশ করে অসন্তোষকে আন্দোলনে রূপান্তর করেছে।’
তবে শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীমউদ্দীনের দাবি, আগাম সতর্কতা হিসেবে তারা তাদের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছেন। বললেন, ‘অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গেও যথাসাধ্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে শুরুটা হয়েছে ডিএমপিতে (রাজধানী ঢাকায়)। এটা আমাদের আওতাধীন নয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘অনেক শ্রমিকনেতা এবং মালিকদের অনেকেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের অনুসারী এবং নেতাকর্মী। এই আন্দোলনে তারা নানাভাবে ভূমিকা রাখছেন। বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সেজে অনেকে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এসব বিষয়ে সম্পৃক্ত করছি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হলে উৎপাদন, রপ্তানি আদেশ ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারখানায় কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ কিংবা সংঘাতের মতো পরিস্থিতি শুধু শ্রমিক ও মালিকপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।



