রোহিঙ্গা নিয়ে নেপিদোর ‘ভুল তথ্যে’ ঢাকার আপত্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নিয়ে গত ১৫ আগস্ট একটি বিবৃতি দিয়েছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিবৃতিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ‘তিন লাখের কিছু বেশি’ এবং তাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করে নেপিদো। এ বিষয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।
আপত্তি জানাতে আজ মঙ্গলবার রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সো মোকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজ কার্যালয়ে ডেকেছিলেন মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান।
মিয়ানমারের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের মধ্য থেকে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া তিন লাখের কিছু বেশি ব্যক্তিদের ফেরত (প্রত্যাবাসন) নেওয়া হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের দেওয়া তালিকায় যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে দেশটি।
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমার দাবি করেছে, যে জাতিগত নামে (রোহিঙ্গা) তাদের পরিচয় করানো হচ্ছে, সেই নামে কোনো গোষ্ঠী দেশটিতে নেই।
রাষ্ট্রদূতকে সম্মত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য অনুরোধ করেন তৌফিক-উর-রহমান। এই প্রক্রিয়ায় শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন ছাড়তে বাধ্য হওয়া নতুন আগতদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে বলেন তিনি।
মিয়ানমার তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা সবাইকে মিয়ানমারের বলে প্রচার করা হচ্ছে। অন্যান্য দেশে যাওয়া ব্যক্তিদের মিয়ানমারে কখনো না থাকা একটি জাতিগত পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সমাধানের বিষয় হলেও এটিকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মিয়ানমারের দাবি, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে আরসা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাটালিয়নে সমন্বিত হামলা চালায়। যার ‘প্রতিরক্ষামূলক জবাব’ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালায় দেশটির রাষ্ট্রীয় বাহিনী। আরসার হুমকির কারণে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অন্য শহর ও গ্রামে চলে যায়, আর ‘বিপুলসংখ্যক বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। আরসার হামলার আগে বুথিদং, মংডু ও রাথিডং টাউনশিপে সাত লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বাস করত। ঘটনার পর সেখানে দুই লাখের বেশি থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায়।
এই হিসাবের ভিত্তিতে মিয়ানমারের দাবি, ‘রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত’ তথ্যটি সঠিক নয়। এই বিবৃতির প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাসহ ওই বিবৃতির অনেক অংশই ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। জাতিসংঘ ব্যবস্থায় নিবন্ধিত তথ্যই রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যা তুলে ধরে।
রাষ্ট্রদূতকে সম্মত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য অনুরোধ করেন তৌফিক-উর-রহমান। এই প্রক্রিয়ায় শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন ছাড়তে বাধ্য হওয়া নতুন আগতদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে বলেন তিনি।
তবে দেশটির বিবৃতি অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুতদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে মিয়ানমার।
চুক্তি অনুযায়ী তিন দফায় তাদের ফেরত নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ‘একজনও’ ফেরত যায়নি বলে দাবি করেছে নেপিদো। বাংলাদেশের দেওয়া আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করেছে। যার মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জন রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা বলে প্রমাণিত, চার হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে চিহ্নিত এবং এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তৌফিক-উর-রহমান রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বলেছেন, বাংলাদেশ তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তথ্য যথাসময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি এই অতিরিক্ত তথ্যগুলো যাচাই প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করেন। এসময় উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নয়, কারণ তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে। মিয়ানমারও এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
এ সময় রাষ্ট্রদূত সো মো নেপিদোতে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি যাচাইকৃত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আগে মিয়ানমার বলেছিল, যাচাই হওয়া বাস্তুচ্যুতদের দ্রুত ফেরত নিতে ‘আন্তরিক সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ চলছে। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে যাচাই হওয়া রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দাদের গ্রহণ করা হবে।
তবে মহাপরিচালক জোর দিয়েছেন, এ সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন।







