বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখানো বিশ্বব্যাংক বড় সংকটে
- ৮০ কোটি চাকরির এক বিপুল ঘাটতি
- সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি মুলধন ১১২ বিলিয়ন ডলার উন্নীত
- বাংলাদেশের সঙ্গে অংশিদারিত্ব চুক্তি শিগগিরই
- বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ সম্মেলন উদ্বোধন থাই-প্রধানমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি
যে বিশ্বব্যাংক আট দশক আগে ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, ৮২ বছর পার করে সেই প্রতিষ্ঠানটিই আজ অভূতপূর্ব এক সংকটের মুখোমুখি। কারণ প্রায় ৮০ কোটি চাকরির এক বিশাল ঘাটতি চোখের সামনে। এতে একটি প্রজন্মের প্রশ্ন— আমাদের জন্য কী এ পৃথিবীতে কোনো জায়গা (চাকরি) নেই বা এই বিশ্ব অর্থনীতিতে কী কোনো ভবিষ্যৎ আছে আমাদের?
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গার যখন এমন তথ্য মঞ্চে তুলে ধরেন, তা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। শুক্রবার ব্যাংককের রানি সিরিকিত জাতীয় কনভেনশন সেন্টারের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বলেন, ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই বিশ্বের ৪৪টি দেশ এক হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় একে অপরকে সাহায্য করে বিশ্বকে আবার গড়ে তুলতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই জন্ম বিশ্বব্যাংকের। তারা বুঝেছিল, সমৃদ্ধি একা ভোগ করার জিনিস নয়। এক দেশের উন্নতি অন্য দেশের জন্য সুফল নিয়ে আসে। কিন্তু আজকের দিনে সেই চ্যালেঞ্জটি এসে ঠেকেছে মানুষের জীবন-জীবিকায়। বিশ্বে প্রায় ৮০ কোটি তরুণের কাজের ব্যবস্থা নেই।
একটি চাকরি কেবল উপার্জনের উপায় নয়, এটি একজন মানুষের আত্মমর্যাদা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার শক্তি। চাকরি পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য হল— একজন তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন চাকরি পেয়ে। আর যিনি বেকার তিনি একটি ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন। তবে সম্ভাবনাকে অবিকশিত রেখে দিলে এর পরিণতি সীমান্ত অতিক্রম অর্থাৎ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গত ১২ অক্টোবর থেকে ব্যাংককে শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বার্ষিক সম্মেলন। বৃহস্পতিবার এর উদ্বোধন করেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। এ উপলক্ষে থাইল্যান্ডের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী একনীতি নিতিতান প্রফাস এবং ব্যাংক অব থাইল্যান্ডের গভর্নর ভিথাই রত্তনাগর্ন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধারা, উদীয়মান চ্যালেঞ্জসমূহ এবং আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকনির্দেশনা সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে শুনেন।
একই মঞ্চে আইএমএফ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা গিওর্গিয়েভা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোকে সহায়তা, স্থিতিস্থাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণে আইএমএফ-এর ভূমিকা তুলে ধরেন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সভাপতি অজয় বঙ্গ বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে। কিন্তু তাদের বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে মাত্র ৪০ কোটির মতো। অর্থাৎ, সরাসরি ৮০ কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের বিশাল ঘাটতি তৈরি হতে যাচ্ছে। এটি মোকাবিলা করতে ভৌত ও মানবিক অবকাঠামোর আওতায় বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৪০ বিলিয়ন ডলার (মোট অর্থায়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারি খাতের অর্থায়নের ৩০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে নীতি সংস্কারে। আর বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে 'প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট ল্যাব'-এর মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন ও গ্যারান্টি সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ ৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার ৫৫ শতাংশই গেছে চাকরি সৃষ্টিকারী অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি ও শিল্প খাতে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই ৮০ কোটি চাকরির ব্যবধান একটি পূর্বাভাস। সুনির্দিষ্ট নীতি, মিশ্র অর্থায়ন ও ‘স্মল এআই’ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকটকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব চুক্ত
এদিকে বৃহস্পতিবার সিরিকিত ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে দিনের শুরুতে ব্যাংক অব আমেরিকা, গুগল, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংক, মুডিসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে বাংলাদেশের সার্বিক বিষয়, ঋণের ইস্যু, আর্থিক খাতে সংস্কারসহ অন্যান্য ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধি দল বসে চুক্তির ইস্যুগুলো চুড়ান্ত করবে। তবে মূল নীতিগত বিষয়গুলোতে কোনো সমস্যা না থাকলেও, আলোচনা শেষে বিষয়গুলো কীভাবে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে তা এই যৌথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
বৈঠক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলছেন, বর্তমান বছরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহও বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। সেটি বিবেচনায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা পুনর্ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন ফ্রেমওয়াার্ক এগ্রিমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে।
পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী চাপে থাকলেও সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার পাশাপাশি নতুন করে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে।
ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার এসব চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে।





