পা বাড়ছে ইলেকট্রিক যানে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রস্তাব ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য ইলেকট্রিক মিনিবাস আমদানির। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমদানি করবে, কোনো শুল্ক দিতে হবে না তাদের। পরে তাতে যোগ হলো অন্যান্য বাস। এখন বাসের পথ ধরেছে ট্রাকও। তবে বাস ও ট্রাক আমদানিকারকদের ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বর্তমানে কত শতাংশ শুল্ক ধরা আছে। এককথায় জবাব দিতে পারলেন না। বিড়বিড় করে কর গুনে হিসাব করছিলেন কাস্টমস শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর, অগ্রিম আয়কর...। শেষ পর্যন্ত পারলেনই না।
অগত্যা সংশ্লিষ্ট ডেস্ক অফিসারকে ডেকে পাঠালেন। তার মুখস্থ জবাব, ‘সব শুল্ক ও কর মিলে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ।’
কর শুল্ক কমিয়ে সরকার খানিকটা রাজস্ব সমস্যায় পড়বে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও কেন এ সিদ্ধান্ত? এক কথায়, জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে। জ্বালানিনির্ভর গণপরিবহন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি সব সংস্থার। এতে পরিবেশ দূষণ হয় ব্যাপকভাবে। ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিল আমাদের কতটা নির্ভরতা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিতে। বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীল, বাংলাদেশের বাজারও একই পথে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যুদ্ধকালে হঠাৎ বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বেড়ে গেছে। ছোট মেয়াদে কিছু রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও বড় মেয়াদে জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বায়ুদূষণ কমে কিছুটা হলেও হবে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা। সবসুদ্ধ স্বার্থরক্ষা হবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে।
ই-গাড়ির যুগে প্রবেশ করা সময়ের দাবি, এটা কোনো অপশন না। এখানে যেতেই হবে
এই জায়গা থেকেই জ্বালানি সাশ্রয়ী বিকল্প পরিবহনের বিষয়টি মাথায় আসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের। তিনি ডেকে পাঠালেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। আইডিয়া দিলেন। সে মতে তৈরি হয়ে গেল প্রস্তাব। উঠে গেল মন্ত্রিসভার বৈঠকে।
সেখানে সবাই একমত, এভাবে পরিবেশ দূষণ মানা যায় না। পরিবহন নির্গত ধোঁয়া দীর্ঘমেয়াদে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসজনিত রোগের কারণ। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তার ওপর ডিজেল আমদানি করতে করতে হয়রান হয়ে যেতে হয়। যতই শুল্ক-কর আসুক না কেন, পরনির্ভরতার এ ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে; জোরালো মত মন্ত্রিসভার সদস্যদের। সিদ্ধান্ত এলো, ‘জ্বালানি তেলের ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ হ্রাসকল্পে পরিবেশবান্ধব সম্পূর্ণ নতুন ইলেকট্রিক বাস নিবন্ধিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিনা শুল্কে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সর্বসাকূল্যে ২০ শতাংশ শুল্কে আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হলো।’ সেদিন ছিল ২ এপ্রিল।
পরে গত ৩ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে অন্যান্য বাস আমদানির শুল্ক আরও ৫ শতাংশ কমানো হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না অর্থমন্ত্রী। অর্থাৎ উদ্যোক্তামন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে পাস হয়ে গেল কর আরও কমানোর সিদ্ধান্ত।
শুল্ক-কর অব্যাহতির সুবিধার যে অপব্যবহার হতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। সেখানেই সিদ্ধান্ত কর অব্যাহতির সুবিধা ৩০ জুন পর্যন্ত সীমিত রাখার। শূন্য শুল্ক-করের প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। ১৫ শতাংশের প্রস্তাবেরও প্রজ্ঞাপন হয় হয় করছে। পাঁচ টন বা তারচেয়ে বেশি ধারণ ক্ষমতার ট্রাকও আসবে, সেটির প্রজ্ঞাপনের খসড়াও চলছে।
সবচেয়ে বেশি সুবিধা নেবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। তারা বিনা শুল্কে ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানি করে অভিভাবকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করবে। ডাবল ব্যবসার পথ খুলে দেওয়া
রাজস্ব বোর্ড প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে বলেছে, শিক্ষার্থী বহনকারী সব বাসের রঙ অবশ্যই হলুদ হতে হবে। পাশাপাশি বাসের গায়ে ‘স্কুল বাস, কলেজ বাস, শিক্ষার্থী বাস বা পরিবহন’ শব্দগুলো সহজে দৃশ্যমানভাবে স্পষ্ট করে লিখতে হবে। সরকারের এ উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম খরচে পরিবেশবান্ধব আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে।
রাজস্ব বোর্ডের প্রত্যাশা, এই সিদ্ধান্তে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বাবদ অভিভাবকদের খরচও অনেক কমবে।
কিন্তু আসলেই খরচ কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে উঠে আসছে এমন মন্তব্য, ‘সবচেয়ে বেশি সুবিধা নেবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। তারা বিনা শুল্কে ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানি করে অভিভাবকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করবে। ডাবল ব্যবসার পথ খুলে দেওয়া।’
ইলেকট্রিক বাসের যুগে প্রবেশ করতে সরকারের মধ্যে রয়েছে তাড়াহুড়ো। ৩০ জুনের মধ্যে যারা আবেদন করবেন, তাদের দেওয়া হবে শূন্য শুল্ক-করের সুবিধা। অথচ গবেষণা হয়নি, আইন নেই, বিধি নেই। অবকাঠামোও একটা বড় প্রশ্ন। ছোট্ট একটা স্কুটি। সেটাও চার্জ দিতে হয় তিন থেকে চার ঘণ্টা, যা দিয়ে চলে সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। আমদানি করা ডিজেল দিয়ে গাড়ি চালানো হবে না। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ডিজেল ব্যবহার হয়।
আবার বলা হচ্ছে, এগুলো পরিবেশবান্ধব। তাহলে ব্যাটারিগুলো যাবে কোথায়? তিন থেকে পাঁচ বছর আয়ুষ্কালের পর এগুলোর পরিণতি নিয়ে উদ্বেগও আছে। কারণ, সেখানেও ঘটবে পরিবেশ দূষণ। ইলেকট্রিক বাস সেটাও তো বিদ্যুতেই চলবে। বিদ্যুৎ তৈরিতে জ্বালানি লাগে। ইলেকট্রিক বাসের ব্যাটারি চার্জ হতে কত সময় লাগবে? সেটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে কি না? এসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই কেন আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়ে গেল; এসব মত উঠে আসছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেই।
সমাধান বাতলে দিলেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক। তার মত, ‘ই-গাড়ির যুগে প্রবেশ করা সময়ের দাবি, এটা কোনো অপশন না। এখানে যেতেই হবে।’
এই বিশেষজ্ঞের কাছে প্রশ্ন ছিল, এর অনেক সীমাবদ্ধতার কথাও শোনা যায়। এর মধ্যে ব্যাটারি একটা, যা থেকে দূষণ ছড়ায়। এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন বুয়েটের এ অধ্যাপক, ‘এসব সমস্যা একে একে দূর হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি আসছে। যারা এ কথা বলছেন তারা প্রযুক্তিটা লক্ষ্য করছেন না। ই-গাড়িতে প্লেট ব্যাটারি ব্যবহার হয়, যা লিকুইড না। সলিড ব্যাটারি। সেটা যদি পরিবেশবান্ধব না বানায়, তাহলে বাজারেই আসতে দেবে না। ই-গাড়ির ব্যাটারি বক্স টাইপের ব্যাটারি না। ভেতরে লিকুইড ম্যাটারিয়াল নেই। এ ব্যাটারি সোয়াপ সিস্টেমে বদল করা হয়। পুরনোটা খুলে রেখে নতুন একটা দিয়ে দেবে। ব্যাটারি যে ইম্পোর্ট করবে, সেটা তার দায়িত্ব। এটায় পরিবেশ বিপন্ন করার কিছুই নেই।’
আমাদের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি— এমন প্রশ্নে শামসুল হকের উত্তর, ‘অবকাঠামো সারা দেশের জন্য হতে হবে। ই-গাড়ির স্টেশন সিএনজি বা পেট্রল স্টেশন থেকে স্বতন্ত্র। এখন ইলেকট্রিফিকেশনে যেতে হলে এসব স্টেশনকেই কাস্টমাইজ বা রেট্রোফিকেশন করতে হবে। আয়োজন যে খুব বেশি করতে হবে তা নয়। কিন্তু সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে। যারা গাড়ি আনবে তাদের যেমন, তেমনি স্টেশন তৈরির জন্যও।’
জনবল কি আছে আমাদের— এমন প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘তা নেই। আমাদের শত বছরের সিস্টেম। এটাকে রাতারাতি বদলানো যাবে না। এখানে শুধু চার্জটাই আসল না। ইলেকট্রিক গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের প্রযুক্তিও আলাদা। গ্যারেজগুলোকে তৈরি করতে হবে। সাধারণ ওয়ার্কশপে গেলে কাজ হবে না। এর জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ লাগবে। প্রকৌশলী লাগবে। সেই জনবল তৈরি করতে হবে। পার্কিং ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। রিকন্ডিশনের বিরাট বাজার। তাদেরও এখান থেকে সরার সুযোগ দিতে হবে। তাদেরও সহায়তা দিতে হবে। সব সমান্তরাল ভাবে শুরু করতে হবে। একটু দূরদর্শী হতে হবে।’
আয়োজন যে খুব বেশি করতে হবে তা নয়। কিন্তু সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে। যারা গাড়ি আনবে তাদের যেমন, তেমনি স্টেশন তৈরির জন্যও
সবশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে। বাস-ট্রাকের চার্জিং স্টেশন আমদানি ও স্থাপনের পরিকল্পনা, সড়ক মহাসড়ক ইলেকট্রিক বাস চালানোর উপযোগী করার তাগিদও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এনবিআরকে বলা হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করতে।




