মাহদী আমিন
১০ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ৩৬০ ডিগ্রি কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন

সংগৃহীত ছবি
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম দিনে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এসব কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে।
মাহদী বললেন, জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। সফরের সূচনাতেই সেই লক্ষ্য সফলভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা) জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ডিপ্লোম্যাট সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী পর্বে যোগদানসহ নিউইয়র্ক সফরের প্রথম দিনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ে এই প্রেস ব্রিফিং করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে চার দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিনেই অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল আটটা থেকে শুরু হওয়া তার এই ব্যস্ততা অব্যাহত ছিল রাত আটটা পর্যন্ত। পূর্বনির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে সময়স্বল্পতার কারণে দুটি বাদে বাকি ১০টি কর্মসূচিতেই তিনি সশরীরে অংশ নিয়েছেন।
প্রথম দিনের ১০টি কর্মসূচিকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করে তথ্য তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি বললেন, প্রথম দিনটির সূচনা হয়েছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের কিছু আন্তর্জাতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও ছিলেন। দিনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে আয়োজিত একটি বিশেষ প্রাতরাশ (ব্রেকফাস্ট) কর্মসূচিতে যোগ দেন। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দিনের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আয়োজিত এক নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রথম দিনে জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক ফোরাম ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বললেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী বা প্লেনারি সেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেন। তার সঙ্গে সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল। এটিকে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত উল্লেখ করে মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্ব ইতিহাসে এক পরিবারের তিন সদস্যের এভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
মাহদী আমিন বললেন, এই বিরল গৌরব আরও মহিমান্বিত হয়েছে, যখন প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনটি পরিচালনা করেছেন। একই পরিবারের তিন সদস্যের বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দান এবং একই সাথে নিজ দেশের প্রতিনিধি কর্তৃক অধিবেশন পরিচালনার এই ঘটনাকে ইতিহাসের এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল নজির।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, এছাড়া সফরের প্রথম দিনেই আঞ্চলিক সহযোগিতার জোর তাগিদ দিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকের সার্বিক সাফল্য ও অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বললেন, হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রতিফলিত হয়েছে। হাইতির সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক সক্ষমতাকে তারা কীভাবে কাজে লাগাতে পারে, সে বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের এই বৈশ্বিক সাফল্য থেকে শেখার আগ্রহ ব্যক্ত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, প্রথম দিনেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এক গঠনমূলক, আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে বিজয় এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সফল উপস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান তুর্কি প্রেসিডেন্ট। ভুটান ও মালদ্বীপের মতো তুরস্কের প্রেসিডেন্টও প্রধানমন্ত্রীকে নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। একই সাথে বাংলাদেশ ও তুরস্কের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে কীভাবে আরও জোরদার করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, একটি ছিল জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর সঙ্গে এবং অন্যটি জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে। এতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরানোর বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল বলেও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, প্রথম দিনে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ (ডি-রেগুলেশন), অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বাজেট সহায়তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিশ্বব্যাংক কীভাবে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে এবং আগামী দিনে যৌথ অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে একসঙ্গে কাজ করা যায়, তা বৈঠকে অগ্রাধিকার পায়।
মাহদী আমিন জানান, পূর্বনির্ধারিত যে দুটি মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকতে পারেননি সেগুলোর একটি ছিল ইউরোপিয়ান কাউন্সিল এবং অন্যটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন— জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক।



