দেশে সড়ক-মহাসড়কে ২৭৩৮০ কিমি ক্ষত

সংগৃহীত ছবি
উঠে গেছে সড়কের আস্তর। ভেতরের ইট ভেঙে পরিণত হয়েছে খোয়ায়। কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ছোট-বড় হাজারো গর্ত লুকিয়ে রয়েছে বৃষ্টির জলে। কাদামাটির সঙ্গে গড়াগড়ি করেই চলছে গাড়ি। এ ছবি কোনো গ্রামীণ সড়কের নয়। এ বর্ণনা শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের। পদ্মা সেতু পেরিয়ে শোঁ শোঁ করে ছুটে আসা গাড়িগুলো এখানে এসে শুরু করে ঝিমুতে।
একই দশা বাগেরহাটের শরণখোলায়। সেখানকার গর্তে যেন ঠাঁই নেবে ‘হাঁটু’। বৃষ্টির পানিতে সদরের পাঁচরাস্তা মোড় থেকে বাংলাবাজার চৌকিদার বাড়ি পর্যন্ত তিন কিলোমিটারের সড়কটি পরিণত হয় ঝুঁকিপূর্ণ ‘ডোবায়’। তবু ঝুঁকি নিয়েই এ সড়ক ব্যবহার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সড়ক হোক বা মহাসড়ক, দেশ জুড়ে এখন একই চিত্র। সবখানেই আছে এই খানাখন্দ আর ভাঙাচোরার ছবি।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তথ্য বলছে, মোট ২২ হাজার
৭৩৭ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে সওজের আওতায়। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৪ হাজার ৪০৯ কিলোমিটার
আর আঞ্চলিক মহাসড়ক ৫ হাজার ১০৭ কিলোমিটার। এর বাইরে জেলা পর্যায়ে রয়েছে আরও ১৩ হাজার
২২০ কিলোমিটার। সারা দেশে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক মিলিয়ে বর্তমানে মেরামত করতে হবে—
এমন সড়ক অন্তত ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার।
যদিও এই হিসাবগুলো বন্যার আগের করা। বন্যার পরে
সড়কের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পূর্ণাঙ্গ বের করা হয়নি এখনো।
বন্যার ক্ষতি যুক্ত করলে স্বাভাবিকভাবেই ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ আরও বাড়বে।
সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ভারী বৃষ্টি ও বন্যার পর এখনো সব জায়গার পানি শুকায়নি। তাই ক্ষয়ক্ষতি কেমন হয়েছে, তা পুরোপুরি জানা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের কাজ চলমান। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে এখনো যাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকায় রোদ দেখা যাচ্ছে ধীরে ধীরে, অন্য জায়গাগুলো শুকিয়ে গেলে কাজে গতি ফিরবে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) হিসাব, দেশ জুড়ে পাকা সড়ক রয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২০৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ৩৪ হাজার ৫৬৬ কিলোমিটার। ইউনিয়নে রয়েছে ৩৪ হাজার ৩৮৪ কিলোমিটার। বাকিটা গ্রামীণ পাকা সড়ক। এসবের মধ্যে মেরামতযোগ্য ২৪ হাজার কিলোমিটার। এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতি হয়েছে আরও ১ হাজার ৬৮০ কিলোমিটার সড়কের। বন্যার পরের ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিতের কাজ এখনো চলছে।
এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (রক্ষণাবেক্ষণ) ইফতেখার আলী বললেন, ‘এটি নিয়মিত (প্রতি বছর) মেরামতের অংশ। সাধারণত মোট সড়কের ২০-২৫ শতাংশ প্রতি বছর মেরামত করতে হয়। এবার বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা বাড়বে। বন্যা-পরবর্তী ক্ষতির পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মাঠপর্যায়ে এস্টিমেটের কাজ (আনুমানিক ব্যয়) চলমান রয়েছে।’
মেরামতের জন্য কত টাকা প্রয়োজন, তা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি সওজ। কারণ, কোন জায়গায় কতটুকু মেরামত করতে হবে, সেটিই তাদের জানা নেই। তবে এলজিইডির জন্য এবার রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার মধ্যেই তাদের সারা বছরের কাজ শেষ করতে হবে।
এলজিইডির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য বলছে, বরাদ্দ পাওয়া টাকা দিয়ে ৮ থেকে ৯ হাজার কিলোমিটার সড়ক মেরামত সম্ভব হবে। এর বাইরে ৩ থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মেরামত করা হবে। বাকি অংশগুলো চলতি অর্থবছরে মেরামতের আওতায় আসবে না। সেক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব সড়ক ভাঙাচোরা রয়েছে, এগুলোর অর্ধেকের বেশি ভাঙাচোরাই থেকে যাবে। আর যদি এখন মেরামত করতে হয়, তাহলে আলাদা প্রকল্প নিয়ে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ আনতে হবে।
যদিও বিষয়টিকে সওজ ও এলজিইডির গাফিলতি হিসেবেই দেখছেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক। তার মতে, ‘পুরনো এ প্রতিষ্ঠানেরগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। তবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো যা করে তাকে রক্ষণাবেক্ষণ নয়, পুনর্বাসন বলা যায়। আমাদের এখানে কোনো মেরামত হয় না। নতুন করেই করতে হয়। তাই এত খরচ লাগে। সারা বছর সড়কগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এই পরিমাণ ক্ষতি হতো না, এত বেশি খরচও প্রয়োজন হতো না।’






