১২ হাজার কোটির প্রকল্প প্রস্তাব, বদলে যাচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যসেবার ধরণ

সংগৃহীত ছবি
বদলে যাচ্ছে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার ধরণ। নির্বাচনী ইশতেহার পূরণে মানুষের বাসস্থানের কাছাকাছি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
নতুন পরিকল্পনায় গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়নভিত্তিক একটি প্রাইমারি হেলথ সেন্টার (পিএইচসি) ইউনিট থাকবে। ইউনিয়নের সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে তিনটি হাব। শহরাঞ্চলে ওয়ার্ড অথবা জনসংখ্যার আকার ও সেবা চাহিদা অনুযায়ী ইউনিটের বিন্যাস হবে।
সেন্টার ও হাব একই কাজ করবে না। হাব হবে জনগণের কাছাকাছি স্বাস্থ্য উন্নয়ন, প্রতিরোধ, প্রাথমিক যোগাযোগ ও অনুসরণের স্থান। সেন্টার হবে তুলনামূলক বিস্তৃত চিকিৎসা, মৌলিক রোগনির্ণয়, ফার্মেসি এবং রেফারেল সমন্বয়ের কেন্দ্র।
এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে ‘বাংলাদেশের সব ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, উন্নীতকরণ, নবরূপায়ণ এবং মেরামত ও সংস্কার কাজ’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে আগামী ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি)।
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি নিয়ে গত ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. এহছানুল হক। ওই সভা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পিইসি সভায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহাংগীর হোসেন জানিয়েছেন, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার হাবগুলো দুই ধরনের হবে। টাইপ-এ সমতল ভূমির জন্য এবং টাইপ-বি অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গার জন্য। টাইপ-এ এর প্রত্যেকটির জন্য নির্মাণ বা পুননির্মাণ বাবদ খরচ পড়বে ৪২ লাখ টাকা এবং টাইপ-বি এর প্রত্যেকটির জন্য নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ বাবদ খরচ পড়বে ৫১ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রতিটি ৭৬৫ বর্গফুট হাবের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে বর্গফুট প্রতি ৩ হাজার ৭১৭ টাকা (ভ্যাট, এআইটি, লভ্যাংশ এবং ওভারহেডসহ) এবং ভ্যাট, এআইটি, লভ্যাংশ এবং ওভারহেড বাদ দিয়ে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে বর্গফুট প্রতি ২ হাজার ৪৩৪ টাকা। ৮ হাজার ৩৪৮টি হাব মেরামতের জন্য প্রতিটিতে খরচ পড়বে ৬ লাখ টাকা।
সভায় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি ডিসপোজাল পিট আছে, যেখানে বর্জ্য ধ্বংস করা হবে। অবশিষ্ট বর্জ্য উপজেলা পর্যায়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে।
সভার সভাপতি মো. এহছানুল হক বলেছেন, ভবনগুলোয় র্যাম্প রাখা, ‘জরুরি নির্গমণ, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশণ ব্যবস্থা ও সুপেয় পানির সুব্যবস্থা রাখতে হবে।’ বিষয়টি ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সুপারিশ করেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিটি ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি এনার্জি ইফিসিয়েন্সি গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণ এবং সোলার প্যানেল স্থাপন করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশে মোট ইউনিয়ন সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮৬টি এবং মোট ওয়ার্ড সংখ্যা ৪১ হাজার ২৭৪টি। প্রতি ৩টি ওয়ার্ডের জন্য একটি হাব নির্ধারণ করা হলে মোট হাব সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৫৮টি। এর মধ্যে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৫০টি নতুন হাব নির্মাণ, ৫ হাজার ৯৩৬টি প্রাইমারি হেলথ সেন্টর (পিএইচসি) হাব পুনর্নির্মাণ এবং ৮ হাজার ৩৪৮টি হাব মেরামত করা হবে।
আয়-ব্যয় বিশ্লেষণে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৫০৩ কোটি টাকার আসবাবপত্র, ২৭৭ কোটি টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে। এসব ব্যয় অত্যধিক বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভবন ভাড়া বাবদ ৯ কোটি টাকা, জরিপ (মৃত্তিকা পরীক্ষা) বাবদ ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও বাধাই ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব ব্যয় পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
সভায় বলা হয়, বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর ব্যবহারযোগ্য স্থাপনা, মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্র প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে কি না, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর তা খতিয়ে দেখতে পারে এবং ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া ‘পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র পুননির্মাণ’ নামের অন্য একটি প্রকল্পের আওতায় ৫৯২টি কেন্দ্রের পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের জন্য প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।



