পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন: জরুরি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী

ছবি: আগামীর সময়
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক শুরু হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস রয়েছেন।
এর আগে দুপুর ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে নিজের সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেছেন শ্রমমন্ত্রী।
আজ সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন।
এর আগে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে আজ সারা দিন বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল এবং সাভারের আশুলিয়ায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েকটি স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকায় উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
আন্দোলনের মধ্যেই শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজে ফেরার আহ্বানের পরও বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।
মিরপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন; বন্ধ তিন মেট্রোস্টেশন
রাজধানীর মিরপুরে সকাল থেকেই পোশাকশ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, মিরপুর-১২, মিরপুর-১৪ ও প্রশিকা মোড়সহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ছিলেন।
সকাল থেকে চলা অবরোধ সরাতে পুলিশ উদ্যোগ নিলে শ্রমিকদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদেরও বাধার মুখে পড়তে হয়।
সংঘর্ষের পর নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি তৈরি হয়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্টেশনগুলো আবার চালু করা হয়। বিকেলের দিকে সড়কেও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশ বক্সে আগুন ও ভাঙচুর
গাজীপুরে সকাল সাড়ে আটটার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলন পরে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও টায়ার জ্বালিয়ে ও কাঠ ফেলে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। প্রাথমিকভাবে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কোনাবাড়ী এলাকায় একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তখন পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি ব্যাংকে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় মণ্ডল গ্রুপের একটি কারখানায় দুপুরের দিকে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়ে। পরে বিজিবির পাহারায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
গাজীপুরে অন্তত ১৫টি গাড়ি ভাঙচুরের খবর জানিয়েছে থানা-পুলিশ। প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এতে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকা যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আশুলিয়া-সাভারে শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানায় ছুটি
সাভারের আশুলিয়াতেও আজ সকালে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেন। আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন ও নিউ এজসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
পরে তারা সড়কে অবস্থান নিলে তাদের সঙ্গে অন্য কারখানার শ্রমিকেরাও যোগ দেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কারখানা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারে অন্তত ৫০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে এ খাতে প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুবুল হক সজীব বলেছেন, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানার মালিকরা ছুটি ঘোষণা করেছেন। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মাঠে আছে।
শিল্প পুলিশ আশুলিয়া জোনের পুলিশ সুপার (এসপি) মোমিনুল ইসলাম জানান, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সব ধরনের চেষ্টা করছে। বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কারখানার কাজ বন্ধ রেখেছেন।
আন্দোলনের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তারের খবর
মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টার অভিযোগে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানিয়েছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে একটি পক্ষ সহিংসতা ও নাশকতার চেষ্টা করছিল। এ ঘটনায় আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, কয়েক দিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। গত শনিবার থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। গতকালও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেছেন, মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ হবে। বিষয়টি শ্রমিকদের বোঝানোর পরও তারা সড়ক ছাড়ছিলেন না। পুলিশের কাছে মনে হয়েছে- আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেছেন, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো লাঠিচার্জ করা হয়নি। কাউকে আটকও করা হয়নি। পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি।




