শিশুদের নীতিনির্ধারণে সম্পৃক্ত করার আহ্বান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি
স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় নীতিনির্ধারণী আলোচনা এবং উন্নয়ন কর্মসূচিতে শিশুদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল নগরায়ন, কমিউনিটির অংশগ্রহণ, আগাম সতর্কতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনের আজিমুন রহমান কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এম এ মুহিত বলেছেন, নগরায়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বায়ুদূষণ, তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও সংক্রামক রোগের বিস্তার শিশুদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই হবে না, দ্রুত বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, নাগরিক সংগঠন এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
তার ভাষ্য, শিশুদের নিয়ে আলোচনা হলেও নীতিনির্ধারণী বৈঠক ও কর্মসূচিতে শিশু প্রতিনিধিদের উপস্থিতি অনেক সময় দেখা যায় না। শিশুদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের কণ্ঠস্বরকে আনুষ্ঠানিকভাবে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অংশ করা না গেলে অনেক উদ্যোগই বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রজন্মের মধ্যে চিন্তাগত দূরত্ব কমিয়ে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, তরুণ ও শিশুদের শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাদের পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শিশু ও তরুণদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এম এ মুহিত বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের একটি বড় শিক্ষা হলো বিভক্তি ও দলীয় পরিচয়ের বাইরে এসে পারস্পরিক আলোচনা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের জায়গা তৈরি করা। এই ঐক্যকে কাজে লাগিয়ে কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। জলবায়ু সহনশীল নগরায়ন, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো দরকার।
তীব্র তাপপ্রবাহের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঠিক স্বাস্থ্যতথ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অতিরিক্ত গরমে শিশুদের পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। প্রতিটি স্কুলে স্থায়ী চিকিৎসক না থাকলেও ভ্রাম্যমাণ বা পরিদর্শনকারী চিকিৎসক ও নার্সদের দল পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি স্কুলে নিরাপদ পানি, ছায়াযুক্ত স্থান, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, রোগের প্রকোপ বাড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে মৌসুম শুরুর আগেই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সতর্কবার্তা প্রচারের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী, স্কাউট, গার্লস গাইড, রেড ক্রিসেন্ট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ডেঙ্গু মৌসুমের দেড় মাস আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্কাউট, গার্লস গাইড ও রেড ক্রিসেন্টসহ প্রায় দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি আয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগাম প্রস্তুতি ও জনসম্পৃক্ততা থাকলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বন্যাদুর্গত এলাকার স্বাস্থ্যসংকট নিয়েও গবেষণা বাড়ানোর আহ্বান জানান এম এ মুহিত। তিনি জানান, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যা, নদীভাঙন ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। বন্যার সময় নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শহরের নগরায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি দূষণ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি বন্যাপ্রবণ এলাকার স্বাস্থ্যসংকট, শিশুদের পুষ্টি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী রোগব্যাধি নিয়েও নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শহর ও বন্যাদুর্গত এলাকার বাস্তবতা এক নয়। তাই সব এলাকার জন্য একই ধরনের নীতি গ্রহণ না করে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইশরাত আজমেরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং তরুণ প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।



