বছরে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে
- বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে আগ্রহী অস্ট্রেলিয়া

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রতিবছর দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ খাতে অর্থায়নের সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এ ঘাটতি পূরণে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিদ্যমান ছয় মাসের নীতি সহায়তার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। এ খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে আগ্রহ দেখিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্লিন এনার্জি খাতের প্রতিনিধিদল।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ প্রস্তাব তুলে ধরেন বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার ক্লিন এনার্জি খাতের প্রতিনিধিদলের চার দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এতে রিনিউয়েবল এনার্জি কাউন্সিল এশিয়া-প্যাসিফিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জন গ্রাইমস, উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্কট হ্যামিল্টনসহ প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুফল পেতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। কিন্তু দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই সক্ষমতা সীমিত। এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বড় সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে নীতি সহায়তার মেয়াদ বাড়ানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবছর গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে। এ জন্য নেট মিটারিং নীতি, পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক (ওপেক্স) মডেলে বিনিয়োগ, ছাদের সৌরবিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা প্রণোদনামূল্যে কেনা এবং যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়ে আনার মতো বিভিন্ন নীতি সহায়তা ঘোষণা করেছে সরকার।
বিএসআরইএ জানায়, ২৪ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত অস্ট্রেলীয় প্রতিনিধিদলের এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কোম্পানি, নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী ও গবেষকদের মধ্যে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ যোগাযোগকে কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দিতে সম্ভাবনাময় প্রকল্প চিহ্নিতকরণ, যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে চায় সংগঠনটি। সফরে স্থানীয় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে বিএসআরইএ। সহযোগিতা করে রিনিউয়েবল এনার্জি কাউন্সিল এশিয়া-প্যাসিফিক (রিক্যাপ), স্মার্ট এনার্জি কাউন্সিল ও অস্ট্রেড।
সংগঠনটির মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সমন্বিত আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং কার্বন ক্রেডিটের মতো বিষয়গুলোকে কার্যকর নীতিমালার আওতায় আনতে হবে।
বিএসআরইএ জানায়, প্রকল্পের প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয়, উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতা ও ঋণ পরিশোধের স্বল্প মেয়াদ বিনিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, জলবায়ু তহবিল এবং দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ নীতিমালা, কার্যকর গ্রিড সংযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং প্রকল্প অনুমোদনে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিএসআরইএ।
সংগঠনটির ভাষ্য, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, সৌর সেচ এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির স্থানীয় উৎপাদন এবং সংযোজন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয় এবং বিদ্যুৎবাজার পরিচালনায় অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে আসতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি। দুই দেশের কোম্পানির যৌথ উদ্যোগ প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
সফরের প্রথম দিন ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সঙ্গে বৈঠক করেন অস্ট্রেলীয় প্রতিনিধিরা। বৈঠকে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
২৫ অক্টোবর নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার নিয়ে ওরিয়েন্টেশন ব্রিফিং, বিএসআরইএর উদ্যোগে সেমিনার এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। এ সময় তারা বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিদ্যুৎ সচিবের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
সফরের শেষ দিন মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনীতে অংশ নেন অস্ট্রেলীয় প্রতিনিধিরা।



