বছরের পর বছর শূন্য পাস তবু ব্যবস্থা নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তিনজন পরীক্ষার্থী। তাদের পড়াতে এমপিওভুক্ত ১১ জন শিক্ষক। বছর জুড়ে ক্লাস হয়েছে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা গেছে সরকারি কোষাগার থেকে। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেখা গেল— এই তিন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি!
এটি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী কারিপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের চিত্র। একই চিত্র সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালীর সাহেবখালী সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এই প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেয় চারজন। পাস করেনি একজনও।
দুটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফলকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলারও সুযোগ নেই। চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি— এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩১২টি। এর মধ্যে শুধু মাদ্রাসাই ২২৬টি। শূন্য পাস করা এসব মাদ্রাসাকে এরই মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। সরকারি বেতন-ভাতা, অনুদান ও নানা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার পরও যেসব প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারছে না, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে এখন সরাসরি প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং সর্বোপরি সরকারি অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি নিয়েও।
শূন্য পাস, তবু সরকারি সুবিধা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত করে তোলা এবং পাবলিক পরীক্ষায় তাদের যোগ্য করে তোলা। সেখানে বছরের পর বছর সরকারি সুবিধা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান যদি শিক্ষার্থীকে পাস করাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটা— এখন সেই হিসাবই সামনে আসছে। কদমতলী কারিপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। মাত্র তিনজন পরীক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন ১১ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক। অথচ ফলাফল শূন্য। অর্থাৎ শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হলেও শিক্ষার ফলাফলে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু একটি বছরের ফলাফল দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা এমপিও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, অনিয়মিত উপস্থিতি, পারিবারিক ও আর্থিক সংকট, পড়াশোনায় অনাগ্রহসহ নানা কারণে ফল বিপর্যয় হতে পারে। তবে এসব কারণের আড়ালে দায়িত্বে অবহেলা, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পাঁচ ধাপে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ: শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আইনে ও বিধিমালায় রয়েছে। তবে সেটি সরাসরি এমপিও বাতিল দিয়ে শুরু হয় না।
প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান ও তদন্ত করা যায়। প্রয়োজনে সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা হয়— নিয়মিত ক্লাস হয় কি না, শিক্ষকরা উপস্থিত থাকেন কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কেমন, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফল কী, আগের বছরগুলোর ফল কেমন ছিল এবং প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও অবকাঠামো ঠিক আছে কি না। তদন্তে অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে দেওয়া যেতে পারে কারণ দর্শানোর নোটিস। এরপর নির্দিষ্ট সময় দিয়ে ফলাফল ও শিক্ষার মান উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানকে রাখা হতে পারে বিশেষ নজরদারিতে। তাতেও উন্নতি না হলে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি। প্রয়োজন হলে তা স্থগিত বা বাতিলও করা সম্ভব। আর সর্বশেষ ধাপে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিল করে সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খোলা থাকলেও এতদিন সেই পথ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আগেও ঘোষণা, ব্যবস্থা কতটা: শতভাগ ফেল বা ভয়াবহ ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা অতীতেও একাধিকবার বলেছেন শিক্ষামন্ত্রীরা। কিন্তু বাস্তবে কতটি প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বাতিল হয়েছে, কতটির অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি বাতিল হয়েছে কিংবা কতটি এমপিও হারিয়েছে— সে প্রশ্নের সন্তোষজনক নজির খুব বেশি নেই। ফলে এবার ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশের পরও সংশয় তৈরি হয়েছে— এবারও কি কারণ দর্শানোর নোটিস ও তদন্তেই বিষয়টি শেষ হবে, নাকি সত্যিই জবাবদিহির আওতায় আসবে প্রতিষ্ঠানগুলো? শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন অবশ্য এবার কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গে মন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য— এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগে তথ্য, তারপর ব্যবস্থা: শিক্ষা প্রশাসনও এবার শুধু ফলাফল দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রতিষ্ঠানের অতীত রেকর্ড যাচাই করছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, সারা দেশে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন বোর্ডভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের সমস্যা ছিল, তার সারসংক্ষেপ তৈরি করা হচ্ছে। এরপর প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তার অতীত রেকর্ড জানা জরুরি। সেই কাজটিই এখন করা হচ্ছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা বললেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রথমে তথ্য যাচাই, এরপর কারণ অনুসন্ধান এবং সবশেষে দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, পরিচালনা, শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ, এমপিও ও শিক্ষা প্রশাসন একক কোনো আইনের অধীনে পরিচালিত না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি জটিল।
২২৬ মাদ্রাসা কেন শূন্য: ৩১২টি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা হওয়ায় বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে এবার। এরই মধ্যে এসব মাদ্রাসাকে শোকজ করা হয়েছে। মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেছেন, এবার শূন্য পাসের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন। আগে নিজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও এবার অন্য কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষার পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে অনেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পায়নি।
জবাবদিহি কোথায়: একদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। কোথাও নিয়মিত ক্লাস হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও এমপিওর মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে বছরের পর বছর। ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো— কতজন শিক্ষক আছেন, কতজন শিক্ষার্থী আছে, কতদিন ধরে ফল খারাপ, নিয়মিত ক্লাস হয় কি না, শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো আদৌ কাঙ্ক্ষিত সেবা দিচ্ছে কি না— এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা।




