শঙ্কা পেরিয়ে সম্প্রীতির উৎসব

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আর নানা অপ্রীতিকর ঘটনার শঙ্কা পেছনে ফেলে এবার আনন্দে মেতেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বাড়তি নিরাপত্তা, প্রশাসনের সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় উপস্থিতি উৎসবের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। বিএনপির সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় পূজা উদযাপনের খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিকট অতীতে এমন শান্তিপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপনের নজির খুব একটা দেখা যায়নি।
ষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের উৎসব গত বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে ছিল ভক্তদের ভিড়। শোভাযাত্রা, সিঁদুর খেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আনন্দ। তবে উৎসবের এ স্বস্তির পাশাপাশি আগামী দিনেও সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রত্যাশা জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
পূজা শুরুর আগে দুটি স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর সংবাদমাধ্যমে এলেও উৎসব শুরু হওয়ার পর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বরং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মণ্ডপে মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোডে বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিজের ফেসবুক পাতায় পোস্ট করে অভিনেতা দীপক কুমার গোস্বামী লিখেছেন, ‘এ বছর ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি রোডের বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রার দৃশ্যটা টাইমলাইনে থাকুক।’ ভিডিওতে দেখা যায়, খোলা রাস্তায় শত শত তরুণী আনন্দে মেতেছেন। তাদের উচ্ছ্বাসে উৎসবের প্রাণবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে। আরেকটি পোস্টে দীপক কুমার লেখেন, ‘বাংলাদেশের শারদীয় উৎসব এবার স্মরণকালের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘খুব ভালো পূজা হয়েছে এবার। উৎসবের আঙ্গিকে এবং সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ছিল। বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সবার অংশগ্রহণে বড় উৎসব হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর সফরে সম্প্রীতির বার্তা
এবারের দুর্গোৎসবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা। বিএনপির সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় পূজার সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। তার এ উদ্যোগকে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা তৈরির ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ঘটনা ছাড়াই সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকার বাইরে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের তিনটি অঞ্চলে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনও উল্লেখযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বগুড়ায় এক মতবিনিময় সভায় মীর শাহে আলম বলেছেন, বিগত নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিএনপির প্রতি আস্থা রেখেছেন। সেই আস্থার প্রতিফলন হিসেবে সরকার তাদের বিশ্বাসের মূল্য দিতে পেরেছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
নিরাপত্তা ও সহযোগিতায় সন্তুষ্ট ভক্তরা
এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা মহানগরে ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ। রাজধানীতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপারেশন) মো. শহীদুল্লাহ বললেন, রাজধানীতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তিনি জানালেন, পূজামণ্ডপগুলোকে গুরুত্ব ও পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রেণিবিন্যাস করে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। দিনরাত পুলিশি উপস্থিতি, সিসি ক্যামেরায় নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে স্থাপন করা হয় আর্চওয়ে। নিয়মিত দায়িত্বের অতিরিক্ত ২ হাজার ৭২ জন পুলিশ সদস্যকে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল। গুজব ও অপতথ্য ঠেকাতেও সাইবার নজরদারি ছিল জোরদার।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেছেন, ‘সুন্দর পরিবেশে পূজা উদযাপিত হয়েছে। চলতি বছর পূজা একদিন বেশি ছিল। বরাদ্দ বেশি ছিল, ছুটিও ছিল বেশি। আনন্দও বেশি ছিল। সরকারের অভূতপূর্ব সহযোগিতার জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।’
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেছেন, ‘বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের সার্বজনীনতা বেশি দেখা গেছে। সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এ প্রাপ্তিকে সামনে রেখে আমরা সামনের দিনের নতুন বাংলাদেশ দেখতে চাই।’



