খারাপ ফলই শেষ কথা নয়...

দেশ জুড়ে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় গত সোমবার দুপুরে। যদিও ফল প্রকাশের আনন্দ সবার ঘরে সমান বার্তা নিয়ে আসেনি। কারও ঘরে বইছে খুশির জোয়ার। আবার কারও ঘরে নেমেছে ঘোর নিস্তব্ধতা। অকৃতকার্য হওয়ার বিষাদ রূপ পাচ্ছে আত্মহননের মতো চরম সিদ্ধান্তেও। জীবনের সূচনাতেই থেমে যাচ্ছে সম্ভাবনা। এ বছর অকৃতকার্য হয়েছে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে কিংবা অকৃতকার্য হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে অনেকেই। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া বহু শিক্ষার্থী এখন পারিবারিক ও সামাজিক হেনস্তার মুখে।
তবে শিক্ষা ও মনোবিদরা বলছেন, এ অবস্থা কখনোই কাম্য নয়। জীবন একটি দীর্ঘ এবং বর্ণিল যাত্রা। একটি মাত্র পরীক্ষার ফল দিয়ে এই পুরো যাত্রার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নিরূপণ সম্ভব নয়। জিপিএ ৫ কিংবা আপাত ভালো ফল শুধুই একটি মাইলফলক, যা জীবনের পথচলার শেষ কথা হতে পারে না। একটা বন্ধ দরজার পেছনে যেমন উন্মোচিত হয় হাজারো নতুন সম্ভাবনা, তেমনি অকৃতকার্য হওয়া মানেই থেমে যাওয়া নয়। অদম্য চেষ্টায় ভুল থেকে শিখে ঘুরে দাঁড়ানোই জীবনের আসল পরীক্ষা।
শিক্ষাবিদদের মতে, শেখার চেয়ে পরীক্ষায় পাসের ওপর বাড়তি চাপই শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীদের বকাঝকা, বাল্যবিয়ের ভয় দেখানো কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করতে হবে। পরীক্ষার ফলের চেয়ে সন্তানের জীবন ও তার ইতিবাচক মানসিক বিকাশ অনেক বেশি মূল্যবান। মানসিক চাপমুক্ত ও স্নেহের পরিবেশই পারে কোনো শিক্ষার্থীকে নতুন উদ্যমে ফিরিয়ে আনতে। আর এই বিশ্বাস পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে গড়ে তুলতে হবে।
রাজশাহীর বাগমারার কারিনা পাল। ছিল বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের হালিমা খাতুন তরিকা। দুই বিষয়ে খারাপ করায় কারিনা আর ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে হালিমা ভেঙে পড়ে চরম হতাশায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুজনই বেছে নেয় আত্মহননের মতো চরম পদক্ষেপ।
ফল প্রকাশের পরপরই আত্মহত্যা, হেনস্তা ও ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়ার খবর শোনা যায় সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারে পরীক্ষার্থী থাকলে তাকে সবসময় চাপমুক্ত এবং ফল প্রকাশের পর সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদযাপনের মাত্রাতেও দেখা যায় বাড়াবাড়ি। এ ধরনের উদযাপন বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখার চেয়ে পরীক্ষায় পাস করার বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মুখস্থ করতে হবে, ভালো রেজাল্ট করতে হবে, এ প্লাস না পেলে পরে ভালো কোথাও ভর্তি হওয়া যাবে না— এমন সব বোঝানো হয়। ফলে বিশ্লেষণের সক্ষমতা, কারিগরি সক্ষমতা বা লেখার সক্ষমতা কমে যায়। এই ট্যাবু বা প্রতিযোগিতার ফলে পরিবার ও সমাজ থেকে নানাভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।’
সবাই যে অকৃতকার্য হয়ে চরম পথে পা বাড়াচ্ছে তা নয়। ফল আশানুরূপ না হওয়া, পরিবারের ভয়, সামাজিকভাবে অপমানিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনাসহ নানা কারণে এমনটা করছে শিক্ষার্থীরা। লেখক, গবেষক ও শিশু অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারার মতে, শুধু পরীক্ষার ফল নয়, একজন শিক্ষার্থীর অবস্থান নির্ধারিত হবে তার মানবিক গুণাবলি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বহুমাত্রিক প্রতিভার ভিত্তিতে। সেই বার্তা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র— সব পর্যায় থেকে একযোগে আসতে হবে।
অধিকারকর্মী ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বললেন, ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরীক্ষার খারাপ ফল শুধু এর চূড়ান্ত অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। শৈশবের মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা এবং পরিবারের মানসিক চাপ কিশোর-কিশোরীদের এ পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। অনেক পরিবারে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে বকাঝকা বা বাল্যবিয়ের হুমকি দেওয়া হয়, যা তাদের গভীর মানসিক সংকটে ফেলে দেয়।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ জানালেন, প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া ও অভিভাবকের চাপ এবং অন্যের সঙ্গে তুলনা আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংবেদনশীল উদযাপনও এই আগুনে ঘি ঢালে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরীর মতে, শুধু অ্যাকাডেমিক ফল নয়; গান, ছবি আঁকা, সাহিত্যচর্চা, খেলাধুলা, বিতর্কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতিভার সমান মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ অভিভাবকদের সতর্ক করে আগামীর সময়কে বলছিলেন, “সন্তান ভালো ফল করুক— এটা প্রত্যেক মা-বাবার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি পরিণত হয় অন্ধ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার চাপে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে জন্ম নেয় ভয়, ব্যর্থতার আতঙ্ক ও আত্মঘৃণা। ‘আমি যদি ফেল করি, মা-বাবাকে কী করে মুখ দেখাব’— এমন প্রশ্ন অনেক সময় তাদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। শুধু সন্তানের ভালো ফলই নয়; পরিবারের উচিত তার মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির বিষয়েও সমান মনোযোগ দেওয়া।”




