বাড়তি ব্যয়ের চাপে উদ্বেগ
তিন মহাদেশ ঘুরে আসছে তেল লিটারে বাড়তি খরচ ৯ টাকা
- প্রচলিত রুটে আসতে আগে লাগত ১২ দিন, এখন লাগবে ৫৫ দিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সৌদি আরবের জ্বালানি তেল এখন তিন মহাদেশ ও দুই মহাসাগর ঘুরে বাংলাদেশে আসছে। সমুদ্রযাত্রার রোমাঞ্চকর শখ নয়, নিতান্ত বাধ্য হয়েই তেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এত দিন হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে সৌদি আরব থেকে সহজে তেলের জাহাজ আসত চট্টগ্রামে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পর হরমুজ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সেই পথ দিয়ে তেল আসা বন্ধ। বিকল্প হিসেবে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইয়েমেনের বাব আল মান্দেব প্রণালি হয়ে তেল আনা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এক লাখ টন তেল আসার পর এখন সেই রুটটিও বন্ধ করে দিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা।
উপায়ান্তর না পেয়ে এখন কঠিন জটিল বিকল্প রুট ধরে এক লাখ টন তেল নিয়ে বাংলাদেশের দিকে ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজ। যে রুটটি দিয়ে আসছে, সেটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র-বাণিজ্যের এক দীর্ঘতম ও নজিরবিহীন রুটের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে রওনা দিয়ে জাহাজটি সুয়েজ খাল অতিক্রম করেছে। এরপর ভূমধ্যসাগর ও জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ঢুকবে। পুরো আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণে কেপ অব গুড হোপ (দক্ষিণ আফ্রিকা) পার হবে। পাড়ি দিতে হবে ভারত মহাসাগরও। সবশেষে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। জাহাজটি চলতে হবে ১৪ হাজার নটিক্যাল মাইল। সময় লাগবে ৫৫ দিন।
সাধারণ রুটে সৌদি আরব থেকে তেল আনতে সময় লাগত মাত্র ১২ দিন। এখন লাগছে প্রায় পাঁচগুণ বেশি সময়। এভাবে দীর্ঘ রুট পাড়ি দিতে গুনতে হবে বিশাল মাশুলও। এই মাশুল জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে যোগ হবে। তখন চড়াদামে বিক্রি করতে হবে সরকারকে, দাম না বাড়ালে বাড়তি মাশুল সরকারকেই গুনতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবের সরকারি বার্ষিক চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল কিনতে সরকারের গড়ে ৭৩ থেকে ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়। ডলার ১২৫ টাকা হিসেবে বাংলাদেশি টাকায় ৯১৮ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ২০৬ কোটি টাকা পরিবহন খরচ যোগ হলে তেলের দাম দাঁড়াবে ১০২৪ কোটি টাকা। দীর্ঘতম রুটের খরচ হিসাব করলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ টাকা ৮৭ পয়সা। আগে প্রায় ৭৮ টাকা ৮৪ পয়সায় এই তেল মিলত। সে হিসেবে শুধু অপরিশোধিত তেলে বাড়তি পরিবহন খরচ লিটারে বাড়বে ৯ টাকা।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেছেন, ‘হরমুজ বন্ধ, বাব আল মান্দেব প্রণালিও বন্ধ। তাই আমার কাছে এটাই শেষ অপশন। বাধ্য হয়েই এই রুট দিয়ে তেল আনতে গিয়ে চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে। একদিকে দেশের তেল সরবরাহ, অন্যদিকে মাশুলের কথাও চিন্তা করতে হচ্ছে। তিন মহাদেশ ঘুরে আসতে জাহাজ মালিক ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০০ কোটি টাকা) পরিবহন খরচ দাবি করেছে। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বাড়তি মাশুল। এরপরও আমরা সংকটকালীন মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দিলে তারা এই বলে রাজি হয়েছে জাহাজ চট্টগ্রাম পৌঁছালে কত পরিবহন খরচ হয়েছে, সেটি আলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে।’
বাংলাদেশ দুটি দেশ থেকেই চুক্তিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনে। সেই তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন শেষে বাজারজাত করা হয়। সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রামে এই তেল এত দিন আসত সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে হরমুজ দিয়ে।
তিন মহাদেশের নতুন এই রুট দিয়ে এখন তেল আনতে গেলে শুধু পরিবহন খরচই পড়বে অনেক টাকা। এ অবস্থায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনতে বড়সড় জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাদ দিয়ে মালয়েশিয়া, আফ্রিকার দেশ থেকে বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ।






