নিজেই ‘আইসিইউ’তে কুড়িগ্রাম হাসপাতাল
নষ্ট যন্ত্র কাটছে দরিদ্রের পকেট

ছবিঃ আগামীর সময়
উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা আর দুধকুমারের কোলঘেঁষা এই জেলার মানুষের লড়াইটা চিরকালই অভাব আর দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। এই জনপদের প্রায় ২৩ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানোর একমাত্র ভরসাস্থল ‘কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল’, যে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই এখন ধুঁকছে নানামুখী সংকটে। ২৫০ শয্যার বিশাল দালান থাকলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নেই আধুনিক নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) সেবা। হাসপাতালের প্রতিটি করিডরে সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়। শয্যার অভাব, জনবল সংকট আর অপরিচ্ছন্নতার চাদরে ঢাকা এই হাসপাতালটি যেন নিজেই এখন ‘মুমূর্ষু রোগী’, যার জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
কাগজে-কলমে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার, কিন্তু গত ৯ বছরেও এখানে সেই অনুযায়ী জনবল নিয়োগ হয়নি। এখনো চলছে ১০০ শয্যার মান্ধাতা আমলের জনবল দিয়ে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১০০ শয্যার জন্য বরাদ্দকৃত ৪৩টি চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। অর্থাৎ জেলার ২৩ লাখ মানুষের ভাগ্যে জুটেছে মাত্র ২৩ জন চিকিৎসক! ১ লাখ মানুষের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১ জন চিকিৎসক—আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এ যেন এক তামাশা। ১০ জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র একজন। ৯টি গুরুত্বপূর্ণ পদই শূন্য পড়ে আছে বছরের পর বছর।
সেবার বদলে ভোগান্তি : রোগীদের আর্তনাদ
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে টিকিট কাটতেই রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হয়। ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে আসা বৃদ্ধা আসমা খাতুন নাতনিকে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অনিশ্চয়তার প্রহর গুনছিলেন। ওয়ার্ডের ভেতরের চিত্র আরও ভয়াবহ।
পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি মাইদুল ইসলাম ঝাড়লেন এক রাশ ক্ষোভ। ‘ডাক্তার আসেন দিনে একবার। বাথরুমের যা অবস্থা, সেখানে যাওয়াই দায়।’
নতুন ভবনের কেবিনগুলোতেও স্বস্তি নেই। কেবিনের বারান্দাগুলো এখন ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। নার্সদের ডাকলে পাওয়া যায় না, খাবার আনতে হয় নিজেদেরই—এমন শত শত অভিযোগ রোগীদের কণ্ঠে।
হৃদরোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য অপরিহার্য ইকো মেশিনটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে প্রায় এক বছর। সরকারিভাবে যেখানে ২০০ টাকায় এই পরীক্ষা করা যেত, সেখানে দরিদ্র রোগীদের বাইরের ক্লিনিকে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। ৫০ বছর বয়সী কমল রবিদাসের মতো নিম্নআয়ের মানুষরা অতিরিক্ত এই খরচের বোঝা বইতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। অথচ এই সংকট দেখার যেন কেউ নেই।
নেই আইসিইউ, আছে কেবল অপেক্ষা
প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি এই হাসপাতালে কোনো আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) স্থাপিত হয়নি। ফলে গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর বা ঢাকায় রেফার করা ছাড়া চিকিৎসকদের আর কিছু করার থাকে না। পথেই অনেক সময় ফুরিয়ে যায় রোগীর আয়ু।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী স্বীকার করলেন কঠিন বাস্তবতার কথা। ‘১২২ জন চিকিৎসকের জায়গায় মাত্র ২৩ জন দিয়ে ৪০০-৫০০ ভর্তি রোগীর সেবা দেওয়া অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। আমাদের জরুরিভিত্তিতে আইসিইউ আর চিকিৎসক প্রয়োজন।’
হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূর নেওয়াজ আহমেদের কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বারবার আবেদন করেও কোনো সুরাহা মেলেনি। সীমিত জনবল দিয়ে তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন, কিন্তু নিয়োগ ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয়।
কুড়িগ্রামের মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে রোগবালাই মানেই যমদূতের হাতছানি। ২৩ লাখ মানুষের এই বিশাল জনপদকে মাত্র ২৩ জন চিকিৎসকের হাতে জিম্মি করে রাখা কতটা মানবিক? কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে ‘অসুস্থ’ দশা থেকে মুক্ত করতে দ্রুত জনবল নিয়োগ ও আইসিইউ স্থাপন এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।















