জীবননগরে ৫ কোটির আধুনিক ভবন এখন ‘ভুতুড়ে বাড়ি’

ছবিঃ আগামীর সময়
একদিকে চিকিৎসার অভাবে মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রোগী, অন্যদিকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই পাঁচ কোটি টাকায নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ভবন পড়ে আছে অবহেলায়। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই বৈপরীত্য এখন এলাকাবাসীর কাছে এক ‘ক্রুর রসিকতা’। আধুনিক লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ আর উন্নত শয্যা— সবই আছে, নেই শুধু সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি। পাঁচ বছর ধরে তালাবদ্ধ থাকা এই ভবনটি এখন কেবলই এক বিশাল ইটের স্তূপ, যা চুয়াডাঙ্গার প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।
কোটি টাকার ভবন যখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানা
২০১৭ সালে যখন চারতলা এই আধুনিক ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়, তখন এলাকাবাসী স্বপ্ন দেখেছিল ঘরের কাছে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার। প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে কাজ শেষ হলেও আজ পর্যন্ত সেখানে কোনো রোগীর পা পড়েনি। ব্যবহারের অভাবে ভবনের দামি লিফটে জং ধরছে, অচল হয়ে পড়ছে এসি, এমনকি দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। রাতের অন্ধকারে জানালা-দরজা ভেঙে এই আধুনিক কাঠামোটি এখন পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে। কোটি টাকার সরকারি সম্পদ যখন চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে, তখন পাশের জীর্ণ ভবনের বারান্দায় ঠাঁই খুঁজছে মুমূর্ষু রোগীরা।
৩১ শয্যার চাপে নাজেহাল স্বাস্থ্যসেবা
হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ৩১ শয্যার হলেও এখানে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। করিডোর থেকে শুরু করে বাথরুমের পাশের নোংরা মেঝে— কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৫০০-এর বেশি মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তিন দিন ধরে মেঝেতে শুয়ে থাকা রমিমা বেগম তুলে ধরলেন তার ক্ষোভের কথা। ‘চারপাশে দুর্গন্ধ, গরমে থাকা যায় না। ডাক্তার ঠিকমতো আসে না। অথচ পাশের বড় দালানটা খালি পড়ে আছে।’ রোগীর স্বজনদের প্রশ্ন— যদি ভবনটি কাজেই না লাগে, তবে জনগণের করের কোটি কোটি টাকা কেন এভাবে অপচয় করা হলো?
জনবল সংকটের অজুহাতে থমকে জীবন
৫০ শয্যার ভবন চালু না হওয়ার পেছনে কর্তৃপক্ষের চিরাচরিত উত্তর ‘জনবল সংকট’। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কুমার পাল স্বীকার করেছেন যে, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় নতুন ভবনটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
কিন্তু এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ভাষ্য, এটি কেবল জনবল সংকট নয়, বরং প্রশাসনিক গাফিলতি ও সদিচ্ছার অভাব। ব্যবসায়ী শামীম সরোয়ারের মতে, সরকার অবকাঠামো গড়ে দিলেও ব্যবস্থাপনার অভাবে মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি।















