ফরিদপুরে রোগীদের অন্তহীন ভোগান্তি
৮ কোটির ক্যাথল্যাব যখন ‘শো-পিস’

ছবিঃ আগামীর সময়
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলার লাখ লাখ মানুষের শেষ ভরসাস্থল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু এই হাসপাতালের দেয়ালগুলোর ভেতরে কান পাতলে কেবলই শোনা যায় অবহেলা আর বঞ্চনার গল্প। যেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি প্রাণ বাঁচানোর কথা, সেখানে কয়েক কোটি টাকার মেশিন পড়ে আছে অচল হয়ে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা’-এর মতো শ্লোগান যখন আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে আয়োজিত নানান সরকারি কর্মসূচিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন ফরিদপুরে হার্টের রোগী কিংবা ক্যানসার আক্রান্ত মানুষগুলো স্রেফ যন্ত্রপাতির অভাবে ঢাকার পথে পাড়ি জমাচ্ছেন। সরকারি এই হাসপাতালটি এখন যেন নিজেই এক ‘অসুস্থ’ প্রতিষ্ঠান, যা খুঁড়িয়ে চলছে জনবল সংকট আর অব্যবস্থাপনার বোঝা নিয়ে।
কাগজে-কলমে ২০২৩ সাল থেকে হাসপাতালটি এক হাজার শয্যায় উন্নীত হলেও বাস্তব চিত্র বড়ই করুণ। প্রজ্ঞাপন জারি হলেও মূলত ৫১৭ শয্যার জনবল ও সরঞ্জাম দিয়েই চলছে ১০০০ শয্যার কার্যক্রম। মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, শয্যার অভাবে মেঝেতে শুয়ে অসংখ্য রোগী। এক হাজার শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি আছে এক হাজার ৪৬ জন। অথচ আজও প্রস্তুত হয়নি বাকি আড়াইশ বেড। অতিরিক্ত এই রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে সীমিত জনবল, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে সম্পদ
হাসপাতালটির হৃদরোগ বিভাগে ২০১৬ সালে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছিল অত্যাধুনিক ‘ক্যাথল্যাব’। উদ্দেশ্য ছিল স্বল্পমূল্যে এনজিওগ্রাম ও রিং পরানোর মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু অজানা কারণে বছরের পর বছর ধরে অচল পড়ে আছে এই ল্যাব। দীর্ঘদিন অব্যবহারে মেশিনটি এখন অকেজো হওয়ার পথে। ফলে শ্যামল হলদার কিংবা শামীম বিশ্বাসের মতো রোগীদের হার্টের সমস্যা নিয়ে জরুরি অবস্থায় ছুটতে হচ্ছে ঢাকায়। অথচ এই ল্যাবটি সচল থাকলে অন্তত দক্ষিণবঙ্গের কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুঝুঁকি ও খরচ—উভয়ই কমতো। একই দশা ক্যানসার চিকিৎসার মেশিনেরও; অযত্ন আর অবহেলায় যা এখন রূপ নিতে চলে স্ক্র্যাপে।
দালাল চক্রের কবলে জরুরি বিভাগ
হাসপাতালের প্রতিটি পদক্ষেপে রোগীদের পোহাতে হয় ভোগান্তি। জরুরি বিভাগে পাওয়া যায় না কোনো সাহায্যকারী। টাকা ছাড়া অনেক কর্মচারী স্ট্রেচার বা হুইল চেয়ার পর্যন্ত টানতে চান না। ফলে মুমূর্ষু রোগীকে কাঁধে করে বা স্বজনদেরই টেনে নিতে হয় ওয়ার্ডে। দুপুর ২টার পর হাসপাতালের এক্স-রে বা প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রোগীদের ছুটতে হয় বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিকে। অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবেই সরকারি এই সেবাগুলোকে অচল করে রাখছে, যাতে বাইরের ক্লিনিকগুলোর ব্যবসা জমজমাট থাকে।
হাসপাতালটিতে । চতুর্থ শ্রেণীর ১৯৫টি পদের মধ্যে ৭২টি পদ খালি থাকায় ক্লিনার ও ওয়ার্ড বয়ের অভাবে হাসপাতালের পরিবেশ হয়ে পড়েছে অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধময়। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. হুমায়ূন কবির জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে জানান, ক্যাথল্যাবটি সচল করতে তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নিমিউকে ((ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ)) চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির দোহাই দিয়ে আজও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সেবা।‘আমরা চিঠি দিয়েছি, কিন্তু তারা জানিয়েছে, মেশিনটি ভালো নেই এবং তারা কাজ করতে পারবে না। তারা পরামর্শ দিয়েছে, যেখান থেকে মেশিনটি কেনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এরপর আমরা এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিলিপসের সাথেও যোগাযোগ করেছি।’- যোগ করেন হাসপাতাল পরিচালক। আড়াইশ শয্যা নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হয় ১৯৯৪ সালে। ২০১৭ সালে নতুন বর্ধিত ভবনসহ ৫১৭ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হয়। এরপর ২০২৩ সালে উন্নীত হয় এক হাজার শয্যার হাসপাতালে। এই হাসপাতালে চিকিৎসকদের মঞ্জুরিকৃত প্রথম শ্রেণির ১৯০টি পদ রয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে কর্মরত ১৪৯টিতে। মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি চিকিৎসক এবং নার্সরাই সময়-অসময়ে ভরসা বলে জানান ভুক্তভোগীরা। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিজৎসকের ১৯০টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত ১৪৯ জন। অন্যদিকে নার্সের ৪৩৫ পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৪৩২ জন। চতুর্থ শ্রেণীর পদ রয়েছে ১৯৫টি, বর্তমানে রয়েছেন ১২৩ জন। যে কারণে সেবা নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। আউটসোর্সিং ভিত্তিতে জনবল নেওয়াও বন্ধ রয়েছে। অফিস সময়ের পরে হাসপাতালের এক্স-রে, সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ থাকায় দুপুর দুইটার পরে রোগীদের এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয় হাসপাতালের বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। দিনের পর দিন এভাবেই চলছে এখানকার চিকিৎসা সেবা। হাসপাতালের নতুন ভবনের প্রবেশ মুখে অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ লেগেই থাকে। লিফট বেশিরভাগ সময়ে থাকে বিকল।ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা শ্যামল হলদার (৫৫)। চিকিৎসা সেবা পেতে গিয়ে ভোগান্তিতে পোহানোর চিত্র তুলে ধরলেন তিনি। ‘আমার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ার পর ডাক্তার এনজিওগ্রাম করতে বলেছেন। এখানে ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় যেতে হয়েছে। এখানে থাকলে আমাদের টাকা-পয়সা অনেক বেঁচে যেত।’‘হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠলে আমার বড় বোনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এখানে উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে। যদি এখানে ক্যাথল্যাব চালু থাকত, তাহলে হয়তো এত ঝামেলা পোহাতে হতো না।’- ক্ষেদোক্তি আরেক ভুক্তভোগী শামীম বিশ্বাসের (৬৫)।হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মো. হুমায়ূন কবিরের ভাষ্য, তারা সেবার মানে বদল আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘লোকবল সংকটের কারণে অনেক সময় আমাদের সেবা দিতে সমস্যা হয়। তবে আমরা চেষ্টা করছি সেই সংকট থেকে বের হয়ে আসার জন্য।’তবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই বেহাল দশা কেবল একটি অঞ্চলের সংকট নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তদারকির অভাবকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কোটি টাকার যন্ত্রপাতি যদি মানুষের কাজে না আসে এবং হাসপাতালের বারান্দায় যদি রোগীদের যন্ত্রণায় কাতরাতে হয়, তবে উন্নয়নের সব দাবিই ফিকে হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে ফরিদপুরবাসীর একটাই দাবি—অচল যন্ত্রপাতি সচল হোক, আর দালালমুক্ত হয়ে হাসপাতালটি ফিরে পাক তার সেবার আসল রূপ।















