‘হামকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছি’
- এক মাসে ২০৬ শিশুর মৃত্যু
- দেশে আক্রান্ত ২০ হাজারের বেশি শিশু
- হাসপাতালে ভর্তি অন্তত ৩ হাজার
- আক্রান্ত হচ্ছে আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
হাম আক্রান্ত অবস্থায় এই মুহূর্তে রয়েছে দেশের ২০ হাজারের বেশি শিশু, যাদের মধ্যে অন্তত তিন হাজার হাসপাতালে। চিকিৎসকদের মতে, দেশে হামের মহামারী চলছে। তা সরকার স্বীকার করুক আর না করুক।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছিলেন, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি অথবা রাজনৈতিক কোন্দল তৈরি হওয়ার ভয়ে হয়তো সরকার এটিকে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করতে দ্বিধা করছে।
তবে দেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এর জন্য কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকেই দুষলেন তিনি। বলছিলেন, ‘হামকে আমরা রীতিমতো আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছি।’
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজন করা হয়েছিল ‘হামে শিশুমৃত্যু : জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন। সেখানেই এ অভিযোগ করলেন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথের (ডিপিপিএইচ) আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাতেই তিনি জানালেন, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে দেশে মৃত্যু হয়েছে ২০৬ শিশুর। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তাদের মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে হাম। বাকিদের শরীরেও ছিল হামের স্পষ্ট লক্ষণ।
সংবাদ সম্মেলনেই জানা গেল, এই মুহূর্তে ২০ হাজারেরও বেশি শিশু হামে আক্রান্ত। যার মধ্যে তিন হাজারেরও বেশি হাসপাতালে ভর্তি।
সাধারণত, একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তাকে বলা হয় মহামারী। এই সাধারণ সংজ্ঞা হিসাব করলেও হাম মহামারী আকার নিয়েছে, মত চিকিৎসকদের।
ডিপিপিএইচের অভিযোগ, কয়েক বছরে টিকা কেনায় গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলাই ডেকে এনেছে এই মহামারীকে।
কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা করা হয়েছে, তা খুঁজতে গেলে অভিযোগের তীর যায় অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করেছিল বাংলাদেশ সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় দেশে চলত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই।
২০২৪ সালের জুনে শেষ হয় চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি। এরপরই ঘটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, পতন ঘটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের।
নানা সংস্কারের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয় নিজেরাই টিকা কেনার, ফলে বাতিল হয় আগের কর্মসূচি। কিন্তু নানা জটিলতায় পার হয়ে যায় ছয় মাস, ফলে টিকা ব্যবস্থাপনার যে চেইন, তাতে বিঘ্ন ঘটে। ২০২৫ সালের শেষদিকে এসে দেখা দেয় টিকার সংকট। এমনকি ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনও সে সময় গড়ায়নি মাঠে।
ডিপিপিএইচের চিকিৎসকরা বলছিলেন, ভিটামিন-এ কাজ করে হাম প্রতিরোধে। কিন্তু গত বছর এই টিকাও দেওয়া হয়নি শিশুদের।
হামের টিকা না দেওয়ার পাশাপাশি ভিটামিন-এ-এর টিকা বাদ পড়ায় বেড়েছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা।
অত্যন্ত সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে হাম অন্যতম, ফলে সহজেই ছড়িয়ে গেছে এটি। পরিস্থিতি এমন হয়েছে, ৯ মাসের কম বয়সীরা তো হচ্ছেই আক্রান্ত, এমনকি আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও হচ্ছে সংক্রমিত। সেই সঙ্গে নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা এই রোগকে করে তুলছে আরও প্রাণঘাতী।
সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন প্রগতিশীল চিকিৎসক ফোরামের সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বললেন, ‘এই সময়েও যদি সরকার নবনির্মিত ছয়টি শিশু হাসপাতাল চালু না করতে পারে, তাহলে সবচেয়ে দুঃখজনক হবে এটি।’
পরিস্থিতি যেন আরও খারাপ না হয় সেজন্য যত দ্রুত সম্ভব দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি চালুর দাবি ডিপিপিএইচের। বিশেষ করে, দুর্গম ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিশ্চিত করা জরুরি হাম এবং ভিটামিন-এ-এর টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ।
পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালে বিশেষ ‘হাম কর্নার’ চালু এবং আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসাসেবার ওপরও দেওয়া হয় গুরুত্ব। প্রস্তাব দেওয়া হয়, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ করার।
আরেকটি সমস্যার কথা তুলে ধরলেন ডা. মুশতাক। তিনি বলছিলেন, হামের চিকিৎসা নির্বিঘ্ন করতে দেশের সব হাসপাতালে করা হয়েছে ছুটি বাতিল। কিন্তু এটি কোনো সমাধান নয়। কারণ কর্মচারীদের জন্য যদি বাড়তি ভাতার ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে তারাও কাজ করতে পারবেন না দীর্ঘদিন।
পাশাপাশি আরও কিছু দাবি উঠে এলো চিকিৎসকদের এই সংগঠনের পক্ষ থেকে। যার মধ্যে রয়েছে, উপজেলাপর্যায়ে ১০০ শয্যা এবং জেলাপর্যায়ে নিশ্চিত করা ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের নেওয়া সরকারি চিকিৎসাসেবার আওতায়, স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে দেওয়া সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং তা নিশ্চিত করা আইনের মাধ্যমে।

