অফিসে কাজ কমাবে আপনারই ডিজিটাল টুইন

স্কেলেটের প্রতিষ্ঠান ব্লোর রিসার্চ এরই মধ্যে তাদের প্রায় ৫০ জন কর্মীর জন্য এ ধরনের ডিজিটাল টুইন তৈরি করেছে। ছবি: প্রতীকী
প্রযুক্তির অগ্রগতির এই সময়ে মানুষ এখন শুধু মেশিন ব্যবহার করছে না, নিজেরই একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তি বিশ্লেষক রিচার্ড স্কেলেট গত তিন বছরে তৈরি করেছেন এমনই এক এআই প্রতিরূপ, যার নাম ‘ডিজিটাল রিচার্ড’।
এই ডিজিটাল সত্তাটি দেখতে সাধারণ একটি স্ক্রিনভিত্তিক টেক্সট উইন্ডো হলেও এর ক্ষমতা অসাধারণ। স্কেলেটের জানা প্রায় সবকিছু জানে। তার মিটিং, ফোনালাপ, ডকুমেন্ট, প্রেজেন্টেশনসহ কাজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিশ্লেষণ করেই এটি তৈরি করা হয়েছে। এতে ছোট একটি ভাষা মডেলের সঙ্গে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে ডেটা প্রসেস করা হয়, তারপর সেটিকে তার চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের ধরনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ফলে এটি এখন শুধুমাত্র তথ্য দেয় না, বরং স্কেলেটের মতো করেই চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে। তিনি তার কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও এই ডিজিটাল টুইনের সাহায্য নিচ্ছেন। এমনকি এতে ‘ফ্যামিলি’ ও ‘অ্যাডমিন’ নামে আলাদা অংশ রয়েছে, যেগুলো অন্য কেউ দেখতে পারে না, কিন্তু সহকর্মীরা কাজসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন।
স্কেলেটের প্রতিষ্ঠান ব্লোর রিসার্চ এরই মধ্যে তাদের প্রায় ৫০ জন কর্মীর জন্য এ ধরনের ডিজিটাল টুইন তৈরি করেছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে নতুন ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কেউ অবসরে যাওয়ার আগে ধীরে ধীরে কাজ কমাতে পারছেন, কারণ তার ডিজিটাল সংস্করণ কিছু দায়িত্ব সামলাচ্ছে।
আবার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা কর্মীর জায়গায় নতুন কাউকে নিয়োগ না দিয়ে তার ডিজিটাল টুইনই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন যারা কোম্পানিতে যোগ দিচ্ছেন, তাদের জন্যও এখন “ডিজিটাল মি” একটি নিয়মিত সুবিধা হয়ে উঠছে।
এই প্রযুক্তি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
আরও অন্তত ২০টি কোম্পানি এটি পরীক্ষা করছে এবং চলতি বছরেই এটি আরও বিস্তৃতভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যার্টনার মনে করছে, খুব শিগগিরই জ্ঞানভিত্তিক কর্মীদের ডিজিটাল প্রতিরূপ মূলধারায় চলে আসবে।
একই সময়ে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের প্রধান নির্বাহী মার্কন জুকারবার্গের একটি এআই সংস্করণ তৈরির কাজ করছে। যা এই ডিজিটাল টুইন প্রবণতাকে নি:সন্দেহে আরও গতিশীল করবে।
তবে এই নতুন প্রযুক্তি যতটা সম্ভাবনার দরজা খুলছে, ততটাই প্রশ্নও তুলছে। একটি ডিজিটাল টুইনের মালিক কে, কর্মী, না প্রতিষ্ঠান? একজন কর্মী যদি তার এআই সংস্করণের মাধ্যমে বেশি কাজ করতে পারেন, তবে কি তার আয়ও বাড়বে? আবার কোনো ভুল হলে দায় নেবে কে?
ফলে সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক নীতিমালা ছাড়া এই প্রযুক্তি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য, নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচয়ের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
স্কেলেটের মতে, একজন কর্মীরই তার ডিজিটাল টুইনের মালিক হওয়া উচিত এবং কোম্পানি সেটি ব্যবহারের জন্য অর্থ দেবে। তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয় কাজের ফলাফল ও মূল্য সৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে, সময়ের ওপর নয়।
ফলে ডিজিটাল টুইনের সাহায্যে বেশি উৎপাদনশীল হলে আয়ও বাড়বে।
বিপরীত মতও রয়েছে। গার্টনার এইচআরের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান কেইলিন লমাস্টার মনে করেন, বেশিরভাগ দেশে কর্মক্ষেত্রে তৈরি তথ্য প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি নিজেও তার প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল টুইন ব্যবহার করছেন এবং দেখছেন, এতে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা অনেক বেড়েছে।
এখন কোনো প্রজেক্টের আপডেট জানতে মিটিং বা ইমেইলের দরকার হয় না, ডিজিটাল টুইনকেই জিজ্ঞেস করলেই চলে।
তার ভাষায়, এই প্রযুক্তি একজন মানুষকে ‘সুপারওয়ার্কার’-এ পরিণত করতে পারে। তার প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে খুব কম, কারণ ডিজিটাল টুইন কাজের গতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে কর্মীদের বোনাস বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে আইনি দিক থেকে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়।
আইনজীবীরা বলছেন, একজন ব্যক্তির ইমেইল, মিটিং ও কাজের তথ্য দিয়ে এআই তৈরি করা হলে তা সরাসরি ব্যক্তিগত অধিকার, সম্মতি এবং শ্রমের বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
ব্রিটিশ আইনজীবী অঞ্জলি মালিক মনে করেন, এটি কর্মসংস্থানের মৌলিক কাঠামোকেই স্পর্শ করছে।স্পষ্ট আইনি নির্দেশনা না থাকলে প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ের জন্যই বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, “ডিজিটাল মি” প্রযুক্তি একদিকে যেমন কর্মজগতকে আরও দ্রুত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে, অন্যদিকে এটি নতুন ধরনের নৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
সঠিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এটি হতে পারে ভবিষ্যতের কাজের ধরন বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় উদ্ভাবনগুলোর একটি।
সূত্র: বিবিসি
