পূর্বাচল স্টেডিয়াম : স্বপ্ন নাকি দুঃস্বপ্ন

সংগৃহীত ছবি
নিজস্ব ঠিকানার স্বপ্ন নিয়েই পূর্বাচল নতুন শহরে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষকর্তারা। সেজন্য সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৩৮ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছিল বিসিবি, যার বর্তমান বাজারমূল্য সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু স্বপ্নের সেই স্টেডিয়াম এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। সরকার পরিবর্তন, নকশা পরিবর্তন ও সময়ক্ষেপণ, সব মিলিয়ে পূর্বাচলের স্টেডিয়ামের জন্য বরাদ্দ জমিতে শুধু ঘাসই বেড়েছে। অঢেল অর্থখরচের পরও খেলার উপযোগী হয়নি মাঠ, গড়ে ওঠেনি কোনো অবকাঠামো।
নাজমুল হাসানের আওয়ামী উদ্যোগ
আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনাকে খুশি করতে তার নামেই তৎকালীন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন স্টেডিয়ামের নাম রেখেছিলেন শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম। ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পপুলাসের পরিচালক অ্যান্ড্রু ফ্রেডেরিক জেমস করেছিলেন একটি চুক্তিও সই। তখন নিজামউদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড শেখ হাসিনা ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণকাজের সম্পন্ন করেছে প্রথম ধাপ। এই কাজ শেষ করার জন্য পপুলাসকে সময় দেওয়া হয়েছে ৪৮ মাস। প্রথম ছয় মাস তারা কাজ করবে নকশা তৈরির এবং পরবর্তী ৩০ মাস ব্যয় করবে ভেন্যুটি নির্মাণে। অবশিষ্ট ১২ মাস তারা কাজ করবে রক্ষণাবেক্ষণের।’
বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী ও পপুলাসের পরিচালক অ্যান্ড্রু ফ্রেডেরিক জেমস করেছিলেন চুক্তি সই। ছবি: সংগৃহীত
এরপর কেটে গেছে অনেক দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পতন ঘটেছে আওয়ামী লীগ সরকারের। বিদেশে পালিয়ে গেছেন তৎকালীন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনসহ বিসিবির অনেক পরিচালক।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল
নতুন করে বিসিবি সভাপতি হন ফারুক আহমেদ, দায়িত্ব পেয়েই তিনি বাতিল করেন পূর্বাচল স্টেডিয়ামের দরপত্র। ফারুক তখন বলেছিলেন, ‘দুটি মাঠ নিয়ে হওয়ার কথা ছিল একটি বড় স্টেডিয়াম। কিন্তু এই মুহূর্তে এই স্টেডিয়ামের জন্য আমরা করতে পারব না এত বড় বাজেট বরাদ্দ। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই প্রকল্প থেকে সরে আসার।’ বিসিবির উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় করে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকার আদলে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য চুক্তি হয়েছিল পপুলাসের সঙ্গে।
এই স্টেডিয়াম নির্মাণের আগেই বিশ্বের বড় বড় ক্রীড়া স্থাপনা দেখে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য একাধিকবার বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আইসিসির সাবেক প্রেসিডেন্ট শশাঙ্ক মনোহর ঢাকায় এলে তার সম্মানে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে উন্মোচন করা হয়েছিল শেখ হাসিনা স্টেডিয়ামের নকশা। অস্ট্রেলিয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পপুলাসকে ৭৬ কোটি টাকা পরিশোধও করেছে বিসিবি।
মাটি চুরি দিয়েই দুঃস্বপ্নের শুরু
সেই নকশা আর থাকছে না রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে। শুধু তাই নয়, বিসিবিও নিজস্ব তহবিলে এই স্টেডিয়াম নির্মাণ থেকে আসে সরে। এরপর আমিনুল ইসলাম বুলবুল সভাপতি হন এবং এই স্টেডিয়াম পরিদর্শনে আসেন আরেক সাবেক অধিনায়ক ও গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ মাসুদ পাইলটকে সঙ্গে নিয়ে। সেখান থেকে মিরপুরে ফিরতে ফিরতেই বুলবুল জানতে পারেন, নির্বাচনে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভেঙে দিয়েছে ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদ।
ঘরোয়া ক্রিকেটের নিচের দিকের স্তরের কিছু ম্যাচ হয়েছে বর্তমানে জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম নামে পরিচিত এই মাঠে। তবে সেখানে নেই কোনো অবকাঠামো। বরং এই স্টেডিয়ামকে ঘিরে হয়েছে নানা ধরনের দুর্নীতি। এই স্টেডিয়ামে মাটি ফেলাকে কেন্দ্র করে হয়েছে হরিলুট, কিছুদিন আগেই গ্রাউন্ডস কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান পাইলট সাংবাদিকদের মাঠ পরিদর্শন শেষে জানিয়েছিলেন, ‘এটা আমি শুনেছি এবং আমাদের একটা টিম আসছিল। আমি যখন দায়িত্ব পাই তার আগ থেকেই আমি শুনেছি এমন একটা ঘটনার কথা। এখানে প্রায় ২০ হাজার ঘনফুটের মতো মাটি পূর্বাচলে পড়ার কথা এবং এখন মাপজোক করে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে সাত হাজার ঘনফুটের মতো মাটি আছে।’
এখন হবে ‘স্পোর্টস হাব’-এর নকশা
শনিবার বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল ও এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক পরিদর্শন করেন পূর্বাচলের আলোচিত এই মাঠ। জুলাই ৩৬ হাইওয়ের পাশে বিস্তীর্ণ পরিত্যক্ত জমির মধ্যে সাইনবোর্ড আর একটা টিনের চালের একতলা শেড; বিসিবির স্বপ্নের স্টেডিয়ামের এই হচ্ছে বর্তমান চেহারা। বিসিবি নিজস্ব অর্থায়নে এই স্টেডিয়াম করার উচ্চাভিলাষ দেখালেও তামিম এবং আমিনুল জানালেন, সেই পরিকল্পনা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে বিসিবি ও সরকার। এখানে শুধুই ক্রিকেটের জন্য স্টেডিয়াম নয় বরং অন্য খেলাকেও সুযোগ দেওয়া হবে, এমনটাই বললেন তামিম, ‘আজকে মন্ত্রী (ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী) এসেছেন, আমরা আজকে পুরো ডিজাইনটা তাকে দেখিয়েছি। এখানে কিছু পরিবর্তন জরুরি। পরিবর্তন করব শুধু পরিবর্তন করার জন্য নয়। কিছু কিছু ডিজাইন পরিবর্তন করা জরুরি। এটা অনেক বড় একটা প্রোপার্টি। মন্ত্রী বললেন, ‘কিছু কিছু স্পোর্টসকে আমরা যদি যুক্ত করে নিতে পারি তাহলে আমাদের স্পোর্টসের জন্য ভালো হবে। টাকার দিক থেকে ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থান হয়তো বা অন্য অনেক বোর্ডের চেয়ে ভালো। আমাদেরও দায়িত্ব অন্য স্পোর্টসকে দেখাশোনা করা।'
নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে প্রস্তাবিত নকশায় পরিবর্তন আনা যায় কি না, সেই ব্যাপারেও খোঁজ নেবেন বলে জানিয়েছেন বিসিবি সভাপতি, ‘ যারা আমাদের এটার ডিজাইন করেছেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। এনএসসির সঙ্গে একসঙ্গে মিলে আমরা এটা করব, কারণ এখানে সরকারের অনেক বড় ইনভেস্টমেন্টেরও প্রয়োজন হতে পারে, যদি আমরা একটা বড় স্টেডিয়াম করতে চাই।’
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেছেন, এই জায়গায় ‘স্পোর্টস হাব’ গড়ে তোলার কথা, ‘পূর্বাচলে বরাদ্দকৃত মাঠে ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণ অবশ্যই হবে। পাশাপাশি এখানে মাল্টিপারপাস স্পোর্টস সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ নিয়ে এরই মধ্যে ক্রিকেট বোর্ড, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমরা চাই, এ প্রকল্প নিয়ে আর কোনো জটিলতা বা বিতর্ক না থাকুক। সবকিছু সমন্বয়ের মাধ্যমে পূর্বাচলে আধুনিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও অন্যান্য ক্রীড়া সুবিধা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।’
পরিশেষে
নতুন সরকার, নতুন পরিকল্পনা। এতে করে অবধারিতভাবেই হবে আরও সময়ক্ষেপণ। তামিম ইকবাল এই মুহূর্তে তিন মাসের মেয়াদে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি, যে কমিটির প্রধান কাজ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও বিসিবির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা। তামিম দায়িত্ব নিয়ে ক্রিকেটারদের বেতন বাড়ানো, ক্যাপটেন্স কার্ড বিতরণসহ অনেক কাজেই ব্যস্ত, এবারে তার কাছ থেকে জানা গেল পূর্বাচল স্টেডিয়াম নিয়ে পরিকল্পনাও। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় তিনি পাবেন কি না, সেটাও অনেকের প্রশ্ন। একই সঙ্গে এনএসসির সম্পৃক্ততা ও ক্রিকেট ছাড়াও অন্যান্য খেলার জন্য জায়গা বরাদ্দ মানেই লালফিতার দীর্ঘসূত্রিতা। সব মিলিয়ে পূর্বাচল স্টেডিয়ামের ভাগ্যে জুটতে যাচ্ছে আবারও অপেক্ষাই। ২০২৭ সালের এশিয়া কাপ ক্রিকেট হওয়ার কথা বাংলাদেশে, বিসিবি চেয়েছিল পূর্বাচলের নতুন স্টেডিয়ামে সেই আয়োজনের কিছু ম্যাচ করতে। বর্তমান বাস্তবতায় যেটা একেবারেই সম্ভব নয়।


