বড়াইবাড়ী দিবস
সীমান্তে সেদিন বুক পেতেছিলেন সাধারণ মানুষও

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
মুক্তিযুদ্ধে কেন গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ, বহু বছর পর একদিন অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে সেটিই বুঝতে পেরেছিলেন কুড়িগ্রামের এ টি এম শামসুজ্জামান রিপন।
কেন অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে হয়েছিল কুড়িগ্রামের একজন সাধারণ তরুণকে, তা জানতে হলে ফিরতে হবে ২৫ বছর আগে।
২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল, কোনো যৌক্তিক কারণ বা ঘোষণা ছাড়াই কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ী সীমান্ত নিয়ে ঢুকে পড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তারা দখল নেওয়ার চেষ্টা করে স্থানীয় বিডিআর ক্যাম্প (বর্তমান বিজিবি) ও বড়াইবাড়ীর। কিন্তু সেই চেষ্টা জীবন দিয়ে প্রতিহত করেন বিজিবি সদস্যরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন রিপনের মতো সাধারণ সীমান্তবাসীও।
‘কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তো সেদিন যাইনি সীমান্তে। আমার মতো আরও অনেকে সেই দুদিনের যুদ্ধে ছিলেন বিডিআরের সহযোগী। আমি চাই, সবাই জানুক এই যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস’
কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ না থাকার পরও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কেন, সেই প্রশ্ন রেখেছিলাম রিপনের কাছে। কী ঘটেছিল সেদিন, জানতে চাই তা-ও।
জবাবে রিপন বললেন, ‘আক্রমণ করেছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এ খবর পেয়ে কোনো কিছু না ভেবে দেশকে রক্ষা করতে বিডিআর বাহিনীর (বর্তমান বিজিবি) সঙ্গে নিই সীমান্তে অবস্থান। আমি ও আমার বন্ধুরা সীমান্তে ছিলাম দুদিন। বিডিআর সদস্যদের পানি এবং এনে দিচ্ছিলাম খাবার। যতটুকু সম্ভব তাদের করছিলাম সহায়তা।’
সে সময় কলেজ শিক্ষার্থী ছিলেন বলে জানালেন তিনি। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘সেদিন ছিল বুধবার। আমরা খবর পাই যে, বাংলাদেশের সীমান্তে চলছে যুদ্ধ। বাড়ি থেকেই আমরা শুনতে পাই গুলির শব্দ। মাঝেমধ্যে পাচ্ছিলাম বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজও। কয়েকজন বন্ধু মিলে চলে যাই বড়াইবাড়ী সীমান্তে। সেখানে ভারত-লাগোয়া একটি খালে লুকিয়ে থাকি। তারপর ক্রলিং করে এগিয়ে যাই। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বিডিআর সদস্যরাও। দুই পাশ থেকেই চলছিল সমানে গুলি।’
যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু তারা যোদ্ধা কি না জানেন না; বলছিলেন রিপন। তবে সেদিন গুলির সামনে দাঁড়িয়ে এটুকু বুঝেছিলেন, ১৯৭১ সালে কেন যুদ্ধে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। কেন তখন কাজ করেনি কোনো পিছুটানই।
মধ্যবয়সী শামসুজ্জামান রিপন বললেন, ‘আমরাও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মানুষের মতো দেশকে ভালোবেসে গিয়েছিলাম সেদিন বর্ডারে।’
বিডিআর-বিএসএফ গোলাগুলি চলার সময় স্থানীয় মানুষও অনেক সহায়াতা করেছিলেন বলে জানালেন রিপন। যার কাছে যে ধরনের সাহায্য চাওয়া হয়েছিল, জীবনের ভয় না রেখেই দিয়েছিল তারা সে সহায়তা।
‘কেউ দিয়েছিলেন খাবার, কেউ পানি আবার কেউ জুগিয়েছিলেন সাহস।’
গোলাগুলির ভয়াবহতা দেখে পরিবারের সদস্যরাও ভেবেছিলেন, হয়তো মারা গেছেন রিপন। কারণ ততক্ষণে সবাই জেনে গেছেন রিপন ও তার বন্ধুরা গিয়েছেন সীমান্তে। তীব্রতা বাড়তে শুরু করলে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদে চলে যান বাড়ির অন্যরা। রিপন তখনো সীমান্তে, বিজিবি সদস্যদের সহযোদ্ধা হিসেবে।
দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে সে সময় তিন বিডিআর জওয়ান শহীদ হন। অন্যদিকে বিএসএফের ১৬ সদস্য নিহত হন।
সীমান্ত থেকে দড়ি বেঁধে বিএসএফ সদস্যদের মরদেহগুলো বাংলাদেশে টেনে এনে পিকআপে তুলেছিলেন স্থানীয় তরুণরাই, জানালেন রিপন।
তবে কত মরদেহ ছিল, তা গুনে দেখার অবস্থা ছিল না বা গুনে দেখার সুযোগ পাননি বলেও জানালেন।
পরে অবশ্য মরদেহগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে দেওয়া হয় ফিরিয়ে।
যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি চান কি না, জানতে চাইলে রিপন বললেন, ‘কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তো সেদিন যাইনি সীমান্তে। আমার মতো আরও অনেকে সেই দুদিনের যুদ্ধে ছিলেন বিডিআরের সহযোগী। আমি চাই, সবাই জানুক এই যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস।’
‘সত্যটা জানলেই হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। স্বীকৃতি পাওয়া-না পাওয়ায় কিছু এসে যায় না।’
সে সময় বিএসএফের গুলিতে আহত হয়েছিলেন আরও ছয় সাধারণ বাংলাদেশি। বিএসএফের মর্টার শেল ও আগুনে বড়াইবাড়ী গ্রাম পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে।
সেই থেকে ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ী দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন সাধারণ মানুষ।


