খুলনায় আইসিইউ সংকট
শয্যার আশায় অন্তহীন অপেক্ষা

ছবিঃ আগামীর সময়
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) একটি শয্যা মানে একটি মুমূর্ষু প্রাণের শেষ আশা। কিন্তু খুলনা বিভাগের দশ জেলার লাখো মানুষের জন্য সেই ‘আশা’ এখন এক দুঃস্বপ্নের নাম। যেখানে একটি শয্যার জন্য প্রতিদিন গড়ে ২০ জন রোগী মৃত্যু নামের যমদূতের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন, সেখানে চিকিৎসাসেবা আর অধিকার নয়, বরং যেনো ভাগ্যের খেলায় পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর স্বজনদের আর্তনাদ, অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালের বিপুল বিল মেটাতে গিয়ে কোনো কোনো স্বজনের ভিটেমাটি বিক্রির দীর্ঘশ্বাস- এ চিত্র নিত্যদিনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে যখন ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা’ নিশ্চিতের বুলি আওড়ানো হচ্ছে, তখন খুলনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র দিচ্ছে উল্টো বার্তা।
খুলনা বিভাগের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে অনুমোদিত আইসিইউ শয্যা মাত্র ২০টি। রোগীর প্রচণ্ড চাপে কোনোমতে আরও ৪টি শয্যা বাড়ানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জলের সমতুল্য। প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন মুমূর্ষু রোগী এখানে একটি শয্যার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। একই অবস্থা খুলনার একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালেও, যেখানে মাত্র ১০টি শয্যার বিপরীতে অপেক্ষায় থাকেন আরও ৫ জন। ফলে প্রতিদিন এই দুটি প্রধান সরকারি হাসপাতালে ২০ থেকে ২৫ জন মুমূর্ষু রোগী কেবল একটি শয্যার অভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
খুমেক হাসপাতাল কেবল খুলনার নয়, বরং সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর থেকে শুরু করে কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরসহ এই অঞ্চলের ১০ জেলার মানুষের শেষ ভরসাস্থল। এমনকি পিরোজপুর ও বরিশাল থেকেও রোগীরা আসেন এখানে। স্ট্রোক, হৃদরোগ কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার রোগীদের জন্য আইসিইউ অপরিহার্য হয়ে পড়লে শুরু হয় এক অমানবিক যুদ্ধ।
খুলনা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও হাসপাতালটির আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. লিপীকা রায় তুলে ধরলেন তার অসহায়ত্বের চিত্র। জানালেন, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ওয়ার্ডের রোগীদের চাপ সামলাতেই তারা হিমশিম খান, বাইরের রোগীদের জন্য মাত্র ৫ শতাংশ সুযোগ অবশিষ্ট থাকে। ‘আমার হাসপাতালে অনুমোদিত-অননুমোদিত মিলে ২৪টি শয্যা চালু রয়েছে। আইসিইউতে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই খুমেক হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আসে। মাত্র ৫ শতাংশ রোগী বাইরে থেকে ভর্তি করা সম্ভব হয়।’
চিকিৎসায় নানান সংকটের তথ্যও টানেন। ‘হাসপাতালে অনুমোদিত ২০টি শয্যার জন্য কমপক্ষে ৮০-৮৫ জন নার্স প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে মাত্র ২৮ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স রয়েছে। এছাড়া আইসিইউর জন্য আলাদা ল্যাব না থাকাও বড় এক সমস্যা।’
‘ওয়ার্ডবয় ও আয়া পদে আউটসোর্সিং কর্মচারীরা কাজ করছেন। তারা কাজ করতে করতে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেও স্থায়ী চাকরির অভাবে অনেকেই অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এতে নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে সময় লাগছে, যা সেবার মানে প্রভাব ফেলছে।’- যোগ করেন লিপীকা রায়।
সরকারি হাসপাতালে ঠাঁই না পেয়ে বাধ্য হয়ে মুমূর্ষু স্বজনকে বাঁচাতে সাধারণ মানুষ ছুটছেন বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। আর সেখানেই লুকিয়ে নির্মম এক ট্র্যাজেডি। নগরের জিন্নাপাড়ার বাসিন্দা শাকিলের পরিবারের গল্পটি এখন খুলনার ঘরে ঘরে। সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে মাত্র দুই দিনেই তাদের গুণতে হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। পরে ভাগ্যের জোরে খুমেক হাসপাতালে শয্যা পেলেও ততক্ষণে পরিবারটি ঋণের সাগরে ডুবে গেছে। মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলো এভাবে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে জমি, গয়না বা শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে।এ প্রসঙ্গে কথা হলে খুমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক সুজাত আহমদ দেখানে পারলেন না কোনো আশার আলো। ‘শয্যা বাড়াতে নতুন জায়গা ও জনবল প্রয়োজন হয়। আপাতত এ ধরনের পরিকল্পনা নেই। তবে শয্যা বাড়ানো ও পৃথক ল্যাব স্থাপনের জন্য চেষ্টা করা হবে।’শয্যা সংকটের পাশাপাশি জনবল সংকটও এখানে প্রকট। নিয়ম অনুযায়ী ২০টি শয্যার জন্য অন্তত ৮০-৮৫ জন নার্স প্রয়োজন হলেও খুমেক হাসপাতালে আছেন মাত্র ২৮ জন। নেই আইসিইউর জন্য পৃথক ল্যাব। আউটসোর্সিং কর্মচারীরা কাজ শিখে দক্ষ হয়ে উঠলেও স্থায়ীকরণের অভাবে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবার মানের ওপর। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শয্যা বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানা গেছে।অথচ পরিবেশগত বিপর্যয় ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে স্ট্রোক ও হৃদরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।খুলনার একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, আইসিইউতে ৬০ শতাংশ রোগী হাসপাতালের ভর্তিকৃতদের মধ্য থেকে নেওয়া হয়। বাকি ৪০ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল থেকে যাচাই-বাছাই করে ভর্তি করা হয়।নগরীর বাসিন্দা আইনজীবী বাবুল হাওলাদারের মতে, বিপুল সংখ্যক মুমূর্ষু মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার নামান্তর এই শয্যা স্বল্পতা। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে শয্যা বাড়ানো, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা।খুলনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই চিত্র কেবল অব্যবস্থাপনার নয়, বরং মানবিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা যদি হয় ‘টাকা’ কিংবা ‘শয্যার অভাব’, তবে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই ম্লান হয়ে যায়। খুলনার মানুষের দাবি এখন একটাই— আর কোনো পরিবার যেন চিকিৎসার বিল মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব না হয়। আর কোনো প্রাণ যেন একটি শয্যার অভাবে অকালে ঝরে না পড়ে।















