স্বাস্থ্যরাজনীতি কারবারিরা আরও মোটাসোটা, ভিটেমাটি বেচে নিঃস্ব রোগী

গভীর রাতে গুরুতর অসুস্থ রোগী। এক হাসপাতাল থেকে আর একটিতে ছুটছেন পরিজনেরা। কোথাও মিলছে না চিকিৎসা। পথেই সাঙ্গ হয় জীবন। এটা মুদ্রার এক পিঠ। আরেক পিঠে দালালদের দাপট। টাকার অভাবে থমকে থাকে উন্নয়ন কাজ। অথচ হাসপাতালের স্টোর রুমে অচল পড়ে থাকে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। আধুনিক ভবন হয়ে যায় ভুতুড়ে আবাসন।
চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ছাই চাপা আগুনের মতো ক্ষোভ চিকিৎসকদের মধ্যেও। মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ করতে করতেই চলে যায় দিন। পরিবর্তন আসে না স্বাস্থ্য খাতে। নতুন সরকার আসে। স্বাস্থ্যরাজনীতি কারবারিদের দিন বদলায়। দিন ফেরে না রোগী আর বেশির ভাগ চিকিৎসকের। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই বদলি, পদোন্নতি থেকে সব কিছুই হয় ওই প্রভাবশালীদের অঙ্গুলি হেলনে। চিকিৎসকরা নিয়মিত আসছেন কিনা? কিংবা এলেও পুরো সময় থাকছেন কিনা তা দেখার সময় কোথায় স্বাস্থ্যরাজনীতি কারবারিদের? তারা ব্যস্ত যন্ত্রপাতি ওষুধ কেনাকাটায়। কারণ, যত কেনাকাটা তত পকেটভারী।
হাসপাতাল কিংবা বাইরে কোথাও নেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। সব হাসপাতালের বাইরে ওত পেতে বসে থাকে অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের সিন্ডিকেট। তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করেই বহন করতে হবে মরদেহ। বাইরে ভাড়া কম হলেও তা নেওয়া যাবে না। তাতে প্রাণ যায়তো যাক। চড়া ভাড়া গুণতে গিয়ে রোগীর পরিজনদের যে পকেট ফাঁকা হচ্ছে, তা আটকাতে আজও কোনো ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি সরকার।
আজ ৭ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এ দিনটি ধরে আগামীর সময়ের প্রতিনিধিরা তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্যখাতের কঙ্কালসার চিত্র। এ বছর স্বাস্থ্য দিবসের মূল স্লোগান বা প্রতিপাদ্য হলো ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ বা ‘স্বাস্থ্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ, বিজ্ঞানের সঙ্গে অবস্থান’। স্লোগান যখন স্বাস্থ্যকর এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের কথা বলছে, তখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিত্র ঠিক তার উল্টো। কোথাও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যার অভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন রোগী, কোথাও আবার কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ভবন পড়ে আছে অবহেলায়। সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে থাকা ভ্যানচালকের কান্না বা বেসরকারি ক্লিনিকের বিল মেটাতে নিঃস্ব হওয়া মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস- এমনটিই দেশের স্বাস্থ্যসেবার নিত্যচিত্র।
খুলনায় আইসিইউ সংকট: শয্যার আশায় অন্তহীন অপেক্ষা
খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার ভরসা খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল। কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র ৩৪টি (অনুমোদিত ও অননুমোদিত মিলে)। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন মুমূর্ষু রোগী একটি শয্যার জন্য করছেন হাহাকার। সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলোকে। খুলনার জিন্নাপাড়ার শাকিলের মতো অসংখ্য রোগী দুই দিন বেসরকারি আইসিইউতে থেকে ৬৫ হাজার টাকা খরচ করে নিঃস্ব হচ্ছেন। অথচ খুমেকের ২০টি শয্যার বিপরীতে ৮৫ জন নার্স প্রয়োজন থাকলেও আছেন মাত্র ২৮ জন। জনবল আর ল্যাবের অভাবে থমকে আছে সেবার মান।
রাজশাহীতে বারান্দাই যখন শেষ আশ্রয়
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিত্র আরও ভয়াবহ। ১২০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকছে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। ৫০০ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। ফলে অর্থোপেডিক থেকে শুরু করে শিশু ওয়ার্ড—সর্বত্রই বারান্দার মেঝেতে কাতরাচ্ছেন রোগীরা। সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভাঙা আলমগীর বা মাথায় জখম নিয়ে আসা দুখু মিয়ারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকছেন বারান্দায়। এমনকি ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে তিন বছরের শিশুকেও থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের করিডোরে। উত্তরাঞ্চলের এই বৃহত্তম হাসপাতালটি যেন নিজেই এখন ‘অসুস্থ’।
ফরিদপুরে অচল পড়ে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার এক ভিন্ন রূপ ফুটে উঠেছে। প্রায় ৮ কোটি টাকা খরচ করে বসানো হৃদরোগ বিভাগের ‘ক্যাথল্যাব’ দীর্ঘদিন ধরে অচল। হার্টের রিং পরানো বা এনজিওগ্রামের জন্য এই অঞ্চলের মানুষকে এখন বাধ্য হয়ে ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ক্যানসার চিকিৎসার মেশিনও। ১০০০ শয্যার প্রশাসনিক অনুমোদন থাকলেও সেবা চলছে ৫১৭ শয্যার জনবল দিয়ে। দালালদের দৌরাত্ম্য আর আউটডোরে আসা ২০০০ রোগীর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকার।
চরাঞ্চল: চিকিৎসাসেবা যেখানে ‘সোনার হরিণ’
কুড়িগ্রামের ২৩ লাখ মানুষের জন্য সদর জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক আছেন মাত্র ২৩ জন! অর্থাৎ প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন ডাক্তার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই হাসপাতালে কোনো আইসিইউ গড়ে ওঠেনি। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ইকো মেশিন।
অন্যদিকে, পাবনার চরাঞ্চলের ২ লাখ মানুষের অবস্থা প্রাগৈতিহাসিক যুগের মতো। হার্ট অ্যাটাক বা প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নিতে হলে এখনো ঘোড়ার গাড়ি বা বাঁশে ঝুলিয়ে পার করতে হয় নদী। যাতায়াত খরচের ভার বইতে না পেরে পথেই প্রাণ হারাচ্ছে অনাগত সন্তান। সরকারের দেওয়া নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটিও লোকবল আর অযত্নে চুরির কবলে পড়ে এখন অকেজো।
আধুনিক ভবন যখন ভুতুড়ে আবাসন
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় নির্মিত ৫০ শয্যার আধুনিক ভবনটি তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ। জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে ভবনটি ব্যবহার হচ্ছে না, অথচ পুরনো ভবনের মেঝেতে শুয়ে থাকছেন রোগীরা। অব্যবহারে ভবনের লিফটে জং ধরছে, এসিতে বাসা বাঁধছে ধুলো।
অন্যদিকে, রাজবাড়ী জেলার ১৬৫ জন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে ১০৫ জন কর্মরত থাকলেও ২২ জনই প্রেষণে ঢাকার বিভিন্ন বড় হাসপাতালে সংযুক্ত। প্রান্তিক মানুষকে সেবাবঞ্চিত রেখে চিকিৎসকদের এই ঢাকা-মুখিতা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বৈষম্যকেই প্রকট করে তুলছে।
দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়লেও জনবল সংকট, ব্যবস্থাপনার অভাব এবং তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে চরের সেই নিঃস্ব মা কিংবা হাসপাতালের বারান্দায় কাতরানো শ্রমিকের প্রশ্ন—চিকিৎসা কি তবে শুধুই ধনীদের জন্য? তবে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কি শুধুই করুণা? এটা কি তাদের সাংবিধানিক অধিকার নয়? সরকারি বরাদ্দ আর জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে-কলমে না থেকে বাস্তবে রূপ পাক, এটাই আজকের দিনে কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন খুলনা ব্যুরো প্রধান এস এম আমিনুল ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো প্রধান আমজাদ হোসেন শিমুল, ফরিদপুর প্রতিনিধি সঞ্জিব দাস, পাবনা প্রতিনিধি রিজভী রাইসুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি তামজিদ হাসান তুরাগ, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি আকিমুল ইসলাম এবং রাজবাড়ীর নিজস্ব প্রতিবেদক মেহেদী হাসান মাসুদ।















