উদ্বেগ সংক্রামকে, মৃত্যু বেশি অসংক্রামকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে একসময় জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় হুমকি ছিল সংক্রামক রোগ। ডেঙ্গু, কলেরা, যক্ষ্মা কিংবা ডায়রিয়ার মতো রোগ মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে সরকার। কিন্তু গত এক দশকে দ্রুত বদলে গেছে স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র। এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস (এনসিডি) বা অসংক্রামক রোগে। দেশের অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৭১ শতাংশের পেছনে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে ৫১ শতাংশের প্রাণ যাচ্ছে অকালেই।
‘অসংক্রামক রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা এটি ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগের লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই শরীরে সৃষ্টি হয় জটিলতা। এ কারণে অনেক রোগী তখনই চিকিৎসকের কাছে যান, যখন রোগটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়’— ভাষ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী ২৮টি সুপারিশ করা হলেও এখনো সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিশ্বের অধিকাংশ দেশ।
গবেষণায় জানা যায়, বর্তমানে দেশে অসুস্থতায় মৃত্যুর ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে প্রতি বছর ৫১ শতাংশ তথা প্রায় ৩ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে বয়স ৪০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ৪৫ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহার করে, প্রতি চারজনের একজন উচ্চ রক্তচাপে এবং প্রতি ১০ জনের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ ছাড়া প্রতি পাঁচ প্রাপ্তবয়স্কের একজন এবং ১২ শতাংশ শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে; প্রতি বছর আত্মহত্যা করেন আনুমানিক ছয় হাজার মানুষ।
তবে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু প্রতিরোধে দেশ জুড়ে ৪৩২টি এনসিডি কর্নার রয়েছে বলে ২০২৫ সালে জাতিসংঘে দাবি করেছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। তিনি জানিয়েছিলেন, সমন্বিত এনসিডি সেবা পাচ্ছেন ১৫ লাখ মানুষ। এতে গত পাঁচ বছরে ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের রোগীকে দেওয়া গেছে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা।
এমন বাস্তবতায় অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৯ জানুয়ারি গঠন করে অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সমন্বয় কমিটি। তবে প্রথম বৈঠকটি হয় ২২ জুন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে এতে অংশ নেন ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা।
সমন্বয় কমিটির প্রথম সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছিলেন, মানুষকে হাঁটাচলা ও শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে। অনেক দেশে মানুষ প্রতিদিন অন্তত তিন কিলোমিটার হাঁটে। ওষুধ বা চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া গেলে অনেকাংশে কমানো সম্ভব অসংক্রামক রোগের প্রকোপ।
৩৫ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ: অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধ কমিটির লক্ষ্য হলো, সমগ্র সরকারভিত্তিক পদ্ধতিতে কাজ করা। অর্থাৎ শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়— শিক্ষা, কৃষি, স্থানীয় সরকার, ক্রীড়া, পরিবহনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে এনসিডি প্রতিরোধে যুক্ত করা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এক মাসের মধ্যে একজন করে ফোকাল পয়েন্ট মনোনয়ন দেবে সব মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি এক থেকে তিন মাসের মধ্যে তৈরি করবে নিজ নিজ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা।
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ার মূল কারণ অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস। পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, শাকসবজি ও দেশীয় ফল কম খাওয়া, অতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত ও ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং অনিয়মিত ঘুম বাড়াচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্কুলে খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় স্থূলতার ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরাও। বাংলাদেশ এখন সংক্রামক ও অসংক্রামক— দুই ধরনের রোগের ‘ডাবল বার্ডেনের মুখোমুখি— এর কারণ তুলে ধরলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল।
শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়; বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর দিলেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তার পরামর্শ, তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত ব্লাডপ্রেশার, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা রোগ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করতে সহায়তা করে। এতে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াই সম্ভব হয় রোগ নিয়ন্ত্রণ। কিডনিসহ জটিল রোগের ঝুঁকিও কমে। রোগ শেষ পর্যায়ে ধরা পড়লে বাড়ে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও অকালমৃত্যুর আশঙ্কা।




