পাবনার চরাঞ্চল
ঘোড়ার গাড়িই যেখানে ‘অ্যাম্বুলেন্স’

ছবিঃ আগামীর সময়
চৈত্রের কাঠফাটা রোদে ধূ ধূ বালুচর, আর বর্ষায় উত্তাল পদ্মা-যমুনার ঢেউ—এই দুই বৈরী প্রকৃতির মাঝেই বন্দি পাবনার তিন উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের জীবন। পাবনার সদর, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের কাছে একটি প্যারাসিটামল কিংবা জরুরি মুহূর্তে একটু অক্সিজেনই যেন সোনার হরিণ। এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ, আর গর্ভবতী হওয়া মানে জীবন-মৃত্যুর এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা। যুগের পর যুগ ধরে চলা এমন অবহেলা চরাঞ্চলকে পরিণত করেছে এক মরণফাঁদে।
জোতকাকুড়িয়া থেকে শুরু করে চরনাগদহ কিংবা ঢালারচর—সবখানেই চিত্রটা একই। মাইলের পর মাইল বালুপথ পাড়ি দিতে ঘোড়ার গাড়িই এখানে একমাত্র ‘অ্যাম্বুলেন্স’। প্রসব বেদনা ওঠা এক মা কিংবা হার্ট অ্যাটাক করা বৃদ্ধকে যখন কাঠের তক্তায় শুইয়ে ঘোড়ার গাড়িতে তোলা হয়, তখন ঝাঁকুনিতে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা সোবহান বিশ্বাসের বর্ণনায় ফুটে ওঠে একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার পাওয়ার সেই লড়াইয়ের চিত্র।- ‘ভাইয়ের বউয়ের প্রসব বেদনা উঠলে ঘরের কপাট খুলে, বাঁশ ও রশি বেঁধে কাঁধে করে দুই ঘণ্টা হেঁটে নদী পার করেছি।’ এই দৃশ্য কোনো সিনেমার নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পাবনার চরাঞ্চলবাসীর প্রাত্যহিক বাস্তবতা।
মাটিতে পড়ে থেকে জং ধরে নষ্ট হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স
অকালে ঝরছে প্রাণ: বঞ্চনার দীর্ঘ তালিকা
চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু নিয়মিত এক ঘটনা। চর মধুপুরের প্রবীণ আফতাব মিঞা তাঁর ৬৫ বছরের জীবনে চোখের সামনে অন্তত ১০টি শিশুকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখেছেন, যাদের ‘অপরাধ’ ছিল শুধুই সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারা।
তেমনি এক অভাগা বাবা সুজন বিশ্বাস। গত বছর সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় তার স্ত্রী অনাগত সন্তানকে হারিয়েছেন। সেই শোক ভুলতে না ভুলতেই এবার আবার যখন স্ত্রীর প্রসবের সময় ঘনিয়ে এল, তখন ঝুঁকি না নিয়ে স্ত্রীকে আগেই নদীর ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সবার কি সেই সামর্থ্য আছে?
১৫ বছরের প্রতিবন্ধী তানিয়ার বাবা আব্দুল মান্নান জানান, শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর ৭০০ টাকা যাতায়াত খরচ জোগানো তার মতো দরিদ্র কৃষকের পক্ষে অসাধ্য।
কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে চরের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো অকেজো। বেড়া উপজেলায় একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হলেও সেটি জনগণের কোনো কাজে আসেনি। রক্ষণাবেক্ষণ আর জনবল সংকটে পানিতে নামার আগেই তার ইঞ্জিন ও কলকবজা চুরি হয়ে গেছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে চরের মানুষের ভরসা কেবলই নিয়তি।ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খানের কণ্ঠে ঝরে পড়ল ক্ষোভ।- ‘ঈশ্বর থাকেন ভদ্রপল্লীতে। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতায় চরের মানুষগুলো বরাবরের মতো বৈষম্যের শিকার।’একই চিত্র বেড়া উপজেলার যমুনার চরগুলোতেও। হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের চরনাগদহ ও চরপেঁচাকোলা; নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরসাফুল্লা, পূর্বশ্রীকন্ঠদিয়া ও আগবাগসোয়ারচর; এবং পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরকল্যানপুর, পেংগুয়ারচর, দেওলাই, পুকুরপাড়, বোড়ামারা, বক্তারপুর, সিংহাসন, গোংগাইদারচর ও ঢালারচরসহ বিস্তীর্ণ জনপদে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস। নদীপথের খেয়া পারাপারই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম দুরবস্থার কারণে আধুনিক সব নাগরিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলা এখানকার মানুষের জীবনকে দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ স্বীকার করেছেন এই ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কথা। তার মতে, চরাঞ্চলের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং সপ্তাহে অন্তত দুদিন ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠানো জরুরি।অন্যদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জান চৌধুরী আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, সরকার মোট জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে এবং বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে পাবনার চরাঞ্চলবাসীর প্রতিটি রাত কাটে আতঙ্কে। চরের ধূ ধূ বালুচরে আর কত প্রাণ ঝরলে নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙবে, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি চরের প্রতিটি বাসিন্দার। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি কার্যকর এবং দ্রুতগতির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে না উঠবে, ততক্ষণ এই ২ লাখ মানুষের জীবন ‘মরণফাঁদ’ হয়েই থাকবে।















