৪০ বছর আগের অবহেলার খেসারত দিচ্ছেন প্রবীণরা
- প্রবীণরাও হামের ঝুঁকিতে, নেই প্রচার-নজরদারি
- বেশি ঝুঁকিতে শারীরিক জটিলতায় আক্রান্তরা
- নিভল আরও ৬ শিশুর প্রাণ, মোট মৃত্যু দাঁড়াল ৪৮১
- টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার সতর্ক করে ইউনিসেফ

প্রতীকী ছবি
সাত বছরের ছোট্ট রাবু যখন হামের যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছিল, তখন পরম মমতায় তাকে আগলে রেখেছিলেন ৬১ বছরের দাদি আলেয়া বেগম। রাবুর সঙ্গে রাজধানীর শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে পালাক্রমে একদিন থাকতেন মা, আরেকদিন দাদি। কয়েক দিন যেতেই দাদি আলেয়া বেগমও সংক্রমিত হন হামে। পরে দাদি ভর্তি হন পাশের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছেন বাসায়। এটি শুধু আলেয়া বেগমের গল্প নয়; দেশের আরও অনেক পরিবারের বাস্তবতা। একসময় যাকে শুধুই শিশুদের রোগ ভাবা হতো, সেই হামে আক্রান্ত হচ্ছেন শিশুদের পাশাপাশি পরিবারের বড়রাও।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হামের বিস্তার ঠেকাতে শুধু শিশুদের টিকাদান যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেও আনতে হবে নজরদারির আওতায়। বয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক জটিলতায় আক্রান্তরা। অথচ প্রবীণদের সুরক্ষায় দেশে সরকারিভাবে কোনো সচেতনতামূলক প্রচার বা আলাদা নির্দেশনা নেই। শৈশবের যে টিকাটি হয়তো বাদ পড়েছিল চার বা পাঁচ দশক আগে, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আজ সেই ভুলের চড়া মূল্য দিচ্ছেন প্রবীণরা। টিকা সংকটে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়ায়, একদিকে যেমন এরই মধ্যে ঝরে গেছে ৪৮১টি শিশুর প্রাণ, তেমনি জীবনের শেষ বিকালে এসে হামের মরণকামড়ে হাসপাতালের আইসোলেশনে ধুঁকছেন প্রবীণরাও।
জনস্বাস্থ্যবিদ মোহাম্মদ ইকবাল জানালেন, হাম শুধু শিশুদের রোগ নয়। বড়দের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে তাদের জন্যও। বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ— যারা ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা অপুষ্টিতে ভুগছেন, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বয়স্ক রোগীদের জন্য আইসোলেশন সুবিধাও অত্যন্ত সীমিত।
রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম আক্রান্ত নাতি রাবু আক্তারের সঙ্গে কয়েক দিন থাকার পর নিজেও হামে সংক্রমিত হন দাদি আলেয়া বেগম। তার পুত্রবধূ শিউলি বেগম আগামীর সময়কে বললেন, ‘মেয়ের শরীরে হাম হওয়ার কয়েক দিন পরেই শাশুড়ির হাম ওঠে। উনার অনেক জ্বর ছিল, সারা গায়ে দানা দানা। শ্বাসকষ্ট ছিল, তবে কম। কিছু খেতে পারতেন না।’ শাশুড়ি ছোটবেলায় টিকা নিয়েছিলেন কি না, তা পুত্রবধূ নিশ্চিত করতে পারেননি।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, আশি ও নব্বই দশকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ তুলনামূলক কম ছিল। তখন যেসব শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা যায়নি, তারা এখন প্রবীণ। তাদের অনেকের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও সময়ের সঙ্গে কমে গেছে। আবার অনেকে ভুগছেন নানান শারীরিক জটিলতায়।
ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত হয়ে জ্বর, তীব্র কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বয়স্ক রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছিলেন, বয়সজনিত কারণে তাদের নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা ও ফুসফুসের সংক্রমণ বেশি থাকে। তবে জটিলতা খুব বেশি মারাত্মক নয়।
রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয় তিনটি ক্যাটাগরিতে। এর মধ্যে আট বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়স্কদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে একটা ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডে ৫১ জন বয়স্ক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।



