দুই প্রণালির আগুনের আঁচ দেশের জ্বালানিতে

ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন দুই সমুদ্রপথ ঘিরে। একদিকে হরমুজ, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব। দুটিই বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র, দুটিতেই এখন অনিশ্চয়তা। আর এ দুই সংকটের ঢেউ এসে লাগছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির গায়ে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা তত দীর্ঘস্থায়ী হবে। স্বল্পমেয়াদে মজুদ ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি-উৎসের বৈচিত্র্য আনাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাত মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত এমনিতেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমিয়ে দিয়েছে অনেক আগে থেকেই। এ যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্য দেশের পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় এখন বাংলাদেশ।
এ অচলাবস্থার মধ্যে নতুন মোড় নিয়েছে যুদ্ধ। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা গত কয়েক দিনে বিস্ময়কর গতিতে অগ্রসর হয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মোখা বন্দরসহ লোহিতসাগর উপকূলের প্রায় পুরো অংশের। সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপসহ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপরও তারা প্রতিষ্ঠা করেছে কর্তৃত্ব; সৌদি-সমর্থিত বাহিনী দ্বীপ ছেড়ে সরে গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হুতিদের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আপাতত ঝুঁকি নেই এবং তাদের অভিযান নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ভিন্ন— বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের দুই লাইফলাইনে একযোগে চাপ সৃষ্টি করে পশ্চিমা জোটের কাছ থেকে দরকষাকষির সুবিধা আদায় করতে চাইতে পারে ইরান।
এ সংকটের বাস্তব ছাপ এরই মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। যার প্রভাবে বিদ্যুৎ ও কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনজীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়। বাড়তি দাম দিয়ে জ্বালানি আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ভর্তুকি বাড়ছে সরকারের।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরকার খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণের বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বে চাহিদা বেশি থাকায় চড়া দাম দিয়েও সময়মতো মিলছে না এলএনজি কার্গো।
এখন বাব আল-মান্দেবেও অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় বিকল্প সমুদ্রপথের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। হরমুজ এড়াতে যেসব জাহাজ লোহিতসাগর-সুয়েজ খাল হয়ে ঘুরপথে চলাচলের কথা ভাবতে পারত, তাদের জন্যও এখন নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই পথে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এশিয়ার তেলনির্ভর এলএনজি চুক্তির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সৌদি আরব কোটি কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানিতে বাব আল-মান্দেব ব্যবহার করেছে। এ প্রণালি ব্যবহার করা না গেলে অঞ্চলটি থেকে কম তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জাহাজগুলোকে দীর্ঘতর পথে চলতে হবে। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জ সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, ‘হরমুজের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেব একটি লাইফলাইন ছিল। এ লাইফলাইন হারানো তেলবাজারের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কতটা অস্থিতিশীল তারও ইঙ্গিত।’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এমনিতেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া। তার ওপর আবার বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত এলাকাগুলো হুতিদের দখলে যাওয়ার খবর গত বৃহস্পতিবার তেলের দাম বেড়ে যায় আরও। আন্তর্জাতিক বাজারের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই— উভয়ের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে যথাক্রমে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ও ১০৩ ডলারে পৌঁছে। মে মাসের পর এটিই ছিল তাদের সর্বোচ্চ দাম।
কেপলারের জ্যেষ্ঠ ক্রুড বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল বলছেন, ‘লোহিতসাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, সৌদি আরবের তেল উৎপাদন কমানো এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।’
‘দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা না থাকায় এবং এসব বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় শোধনাগারগুলো অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল সংগ্রহে বাধ্য হচ্ছে। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে’— যোগ করলেন এ ক্রুড বিশ্লেষক।
সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে বলে জানালেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘যুদ্ধ বা যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে। শুক্রবারও সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে আমাদের। তারা আমাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে। এখন আমরা আগামী বছরের জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করতে পারি, তা নিয়ে কাজ করছি।’
‘এখন পর্যন্ত তেলের মজুদ সন্তোষজনক। সরবরাহকারীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে তারা বিকল্প উৎস থেকে তেল সরবরাহ করবে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি আরও জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন নতুন করে ভাবতে হবে’— যোগ করলেন রফিকুল ইসলাম।
জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান মজুদ পরিস্থিতিতে হঠাৎ সংকট তৈরির শঙ্কা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সামলাতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধান শুরু করেছে। যোগাযোগ রাখা হচ্ছে অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে, তেল আমদানিতেও একাধিক বিকল্প দেশের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনে চীন-জাপানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। সেই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। দূরবর্তী উৎস থেকে জ্বালানি আনতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে, বীমা প্রিমিয়াম বাড়ছে আর দেশীয় গ্যাসের মজুদ ক্রমেই কমে আসায় আমদানিনির্ভরতা এমনিতেই বাড়ছে। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে, শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি-বাণিজ্যও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ভোক্তা-অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমাদের বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এরপরও সরকার আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল করছে। সংকট সামাল দিতে জ্বালানি খাতের সব অপ্রয়োজনীয় ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।’



