থাইল্যান্ডের পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ নেই

লাগেজ হাতে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে বাংলাদেশি পর্যটকদের হুল্লোড় বা মেদপার্ক ও হাসপাতালগুলোয় লাইন দেখলে মনে হবে, থাইল্যান্ডের পর্যটনে বড় অংশ দখল করে আছে বাংলাদেশ। অথচ দেশটির পর্যটকের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার ভারতের নাম উজ্জ্বল থাকলেও এতে বাংলাদেশের নাম নেই। এ তথ্য থাইল্যান্ডের পর্যটন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সরকারি তালিকার।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চীন। সেখান থেকে বছরে গড়ে আসছে ৪০ লাখ পর্যটক। দ্বিতীয় অবস্থানে মালয়েশিয়া যেখান থেকে বছরে আসছে ৩০ লাখের বেশি পর্যটক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান সবচেয়ে মজবুত। তারা ৩ নম্বরে। ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের মতোই স্থিতিশীল। বছরে প্রবেশ করছে ১৭ লাখ ৯০ হাজার ভারতীয়।
বিশ্ব জুড়ে নানা আর্থিক ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার মানুষের থাইল্যান্ডের সমুদ্রসৈকত বা ফুকেটে ঘুরতে আসা বন্ধ হয়নি। তারা রয়েছে ৪ নম্বর স্থানে। সেখান থেকে বছরে আসছে ১১ লাখ ৮০ হাজার।
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বছরে আসছে ৭ লাখ ৭০ হাজার। তাইওয়ান থেকে থাইল্যান্ডে ঘুরতে আসার প্রবণতা বেশ ভালো। আগের বছরের তুলনায় তাদের পর্যটক সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। গড়ে ৭ লাখ ১০ হাজার পর্যটক আসে সেখান থেকে।
অনেক দূরের দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা থেকে থাইল্যান্ডে আসার আগ্রহ সামান্য বেড়েছে। দীর্ঘ দূরত্বের দেশগুলোর মধ্যে তাদেরই ইতিবাচক ধারা। বছরে গড়ে ৬ লাখ ৯০ হাজার আমেরিকান আসছে থাইল্যান্ডে। যুক্তরাজ্য থেকে আসছে ৬ লাখ ৮০ হাজার। এশিয়ার অন্যতম উন্নত দেশ জাপান থেকে থাইল্যান্ডমুখী মানুষের সংখ্যাও দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজারে।
ঢাকায় থাইল্যান্ড দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রতি মাসে ৯ হাজার বাংলাদেশিকে ভিসা ইস্যু করছে। সে হিসেবে বছরে থাইল্যান্ড আসছে ১ লাখ ৮ হাজার জন। এরমধ্যে ৬৫ হাজার ভিসা হচ্ছে চিকিৎসাজনিত ভিসা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড সবচেয়ে পর্যটক আকর্ষণকারী দেশ এবং বিশ্বব্যাপী অবস্থান অষ্টম। দেশটির জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। ২০২৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেছে ২ কোটি ১৮ লাখ পর্যটক। ২০২৫ সালে এর সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ।
থাইল্যান্ডের পর্যটন বিভাগ ২০২৬ সালে পর্যটন খাত থেকে ৮১০ কোটি মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এরমধ্যে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যটকরা প্রায় ৩৩২ কোটি ডলার খরচ করেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪০ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে পর্যটকরা খরচ করেছিল ১ দশমিক ৫৩ ট্রিলিয়ন বাথ (৪৫ বিলিয়ন ডলার) এবং ২০২৪ সালে ৪৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
প্রশ্ন হলো, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি থাইল্যান্ড যান, সেখানে থাই সরকারের প্রধান ট্যুরিজম পলিসিতে বাংলাদেশ কেন অদৃশ্য। এর কারণ অনুসন্ধান করা হয় আগামীর সময়ের পক্ষ থেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, থাইল্যান্ডের পর্যটন মন্ত্রণালয় যে অফিসিয়াল ডেটা প্রকাশ করে, তা মূলত পর্যটন ভিসার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে যাওয়া ভ্রমণকারীদের একটি বিশাল অংশ, প্রায় ৬০ শতাংশ যান সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে— যার নাম মেডিকেল ট্যুরিজম।
ব্যাংককের সুরা হেলথ কেয়ার মেডিকেলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোলেয়ামান জানালেন, প্রতি মাসে অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য আসেন থাইল্যান্ডে। ভ্রমণ ভিসায় আসেন কম।
থাইল্যান্ড সরকার যখন তাদের দেশে কতজন ‘পর্যটক’ এসেছে হিসাব করে, তখন মূলত ঘুরতে, ছুটি কাটাতে বা শপিং করতে (ট্যুরিস্ট ভিসায়) আসেন তাদের গণনা করে। আরও সাধারণ ‘ঘুরতে যাওয়া পর্যটক’ এবং ‘চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগী’—এই দুই ধরনের মানুষের জন্য আলাদা দুটি ক্যাটাগরি থাকে। যেহেতু বাংলাদেশিরা চিকিৎসার জন্য বেশি যান, তাই অফিসিয়াল পর্যটকের তালিকায় তাদের নাম সরাসরি গণনা করা হয় না। ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি ব্যাংককের হাসপাতালে সেবা নিলেও, খাতা-কলমে তাদের ঘুরতে আসা ‘সাধারণ পর্যটক’ হিসেবে দেখানো হয় না। এটাই মূল কারণ।
এ ছাড়া চীন বা মালয়েশিয়া থেকে লাখ লাখ সাধারণ পর্যটক বার্ষিক ছুটিতে থাইল্যান্ড যাচ্ছেন। সেখানে বাংলাদেশ থেকে— বিশেষ করে ব্যবসায়িক, প্রাতিষ্ঠানিক ও চিকিৎসা মিলিয়ে সংখ্যাটা বৈশ্বিক সংখ্যার তুলনায় কম। যে কারণে পর্যটক আগমনের শীর্ষ দশের কোটায়ও জায়গা নেই বাংলাদেশের।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-থাই চেম্বারের প্রেসিডেন্ট শামস মাহমুদ ব্যাংককের একটি হোটেলে বসে আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি। এ দেশে অনেক বাংলাদেশি আসছে মেডিকেল ভিসায়। যে কারণে মূল পর্যটক তালিকায় নেই আমরা।’
গত কয়েক দিন ব্যাংককে অনেক বাংলাদেশির আগমন চোখে পড়েছে। সুকুমভিট বাংলাদেশি বিভিন্ন খাবার হোটেল, বামরুনগ্রাদ আন্তর্জাতিক হাসপাতালের সামনের দিক, ইন্দিরা মার্কেটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অনেক দেখা মিলছে বাংলাদেশি পর্যটকের। একইভাবে পর্যটন অঞ্চল পাতায়ায় বেশ চোখে পড়ছে বাংলাদেশিদের। কিন্তু এদের মধ্যে বড় অংশই প্রবেশ করেছে মেডিকেল ভিসায়।
ঢাকার ধানমন্ডি থেকে রবিন নামের ব্যবসায়ী উঠেছে সুকুমভিট ৭ ক্লাব মাহিন্দ্র হোটেলে। তিনি জানালেন, ব্যবসায়িক কাজে তিনি এসেছেন এবং প্রায় সময় তিনি ব্যবসায়িক কাজে আসেন। ক্লাব মাহিন্দ্র হোটেলের পাশে বাংলা খাবার রেস্টুরেন্টে কথা হয় ঢাকার মামুন হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, একটি ব্যবসায়িক কর্মশালায় যোগ দিতে এসেছেন। তিনি প্রায়ই আসেন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রদর্শনী দেখতে। বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা বাবদ যে বেশি লোক যাচ্ছে, সে বিষয়টি তুলে ধরে কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিতিপর্ন চিরাসাওয়াদি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে মেডিকেল ট্যুরিজমে গুরুত্ব দিচ্ছে থাইল্যান্ড। বছরের পর বছর ধরে একটি বড় সংখ্যক বাংলাদেশি রোগী থাইল্যান্ডকে আস্থার-স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।



