বাংলাদেশের জন্য কাঁদত যে জাপানি হৃদয়

ফাইল ছবি
একটি দেশের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর হলে মৃত্যুর পরও সেই দেশের মাটিতে ঠাঁই পাওয়ার ইচ্ছা জাগে? হাজার মাইল দূরের একটি দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কীভাবে নিজের হৃদয়ে ধারণ করা যায়? আর ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে কীভাবে গড়ে ওঠে এমন এক বন্ধুত্ব, যা মৃত্যুকেও অতিক্রম করে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় একজন জাপানি রাজনীতিবিদের জীবনের দিকে। তার নাম তাকাশি হায়াকাওয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় যারা দেশের সীমানা পেরিয়ে বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল এতটাই গভীর যে মৃত্যুর পর তার দেহভস্মের একাংশ সংরক্ষিত হয় ঢাকার কমলাপুরের একটি বৌদ্ধবিহারে।
জাপানের এই রাজনীতিবিদ শুধু বাংলাদেশের একজন বিদেশি বন্ধু ছিলেন না; এ দেশের মানুষের দুঃসময়কে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেছিলেন। আর সেই দায়বদ্ধতার স্মৃতি আজও বহন করছে বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বের ইতিহাস।
ঘূর্ণিঝড়ের বিপর্যয়ে যাত্রা শুরু
১৯৭০ সাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। প্রাণ হারান বিপুলসংখ্যক মানুষ। জনপদের পর জনপদ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। স্বজনহারা মানুষের কান্না আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
সেই দুর্যোগের খবর পৌঁছে যায় জাপানেও। কিন্তু দূরদেশের মানুষের বিপর্যয়কে নিছক একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ হিসেবে দেখেননি তাকাশি হায়াকাওয়া। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা সংগ্রহে উদ্যোগী হন তিনি।
জাপানের রাস্তায় নেমে ত্রাণ তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগে অংশ নেন হায়াকাওয়া। তখনো বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। দেশটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু মানুষের দুর্দশা তার কাছে কোনো রাজনৈতিক সীমানা কিংবা জাতিগত পরিচয়ের বিষয় ছিল না। মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার কাছে বড় কথা।
হয়তো সেদিনই বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্কের এমন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে আরও গভীর ও ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের খবর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয় আন্তর্জাতিক পরিসরে। এই সময় বাংলাদেশের পক্ষে জাপানে জনমত গড়ে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হায়াকাওয়া। জাপানের রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জন্য সহায়তা জোগাড়ের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে কাজ করেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি তার কাছে কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। তার মতো জাপানি রাজনীতিবিদ ও দেশটির সাধারণ মানুষের সমর্থন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।
স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পরও হায়াকাওয়ার ভূমিকা থেমে থাকেনি। বরং নতুন রাষ্ট্রটির সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক সুদৃঢ় করার কাজে তিনি আরও সক্রিয় হন। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। একই বছরের মার্চে জাপান সরকারের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন হায়াকাওয়া। এ সময় তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে কাছ থেকে দেখেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
যুদ্ধের ক্ষত তখনো দেশের সর্বত্র। অবকাঠামো পুনর্গঠন, অর্থনীতি সচল করা এবং মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করে তোলার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ। এমন সময়ে হায়াকাওয়া নতুন দেশটির পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
পরে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। এই সম্পর্কের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে হায়াকাওয়ার মতো মানুষের আন্তরিক উদ্যোগ স্মরণীয় হয়ে আছে।
মৃত্যুর পরও বাংলাদেশে তার ঠিকানা
হায়াকাওয়ার জীবনের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়টি তার মৃত্যুর পরের ঘটনা। ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ইচ্ছায় তিনি জানিয়ে গিয়েছিলেন, তার দেহভস্মের একাংশ যেন বাংলাদেশে রাখা হয়। সেই ইচ্ছা পূরণ করেন তার স্ত্রী। ১৯৮৩ সালের ৯ নভেম্বর তার দেহভস্মের একাংশ ঢাকার কমলাপুরের একটি বৌদ্ধবিহারে সংরক্ষণ করা হয়।
একটি বন্ধুত্বের উত্তরাধিকার
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক আজ বহুমাত্রিক। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং জনশক্তি বিনিময়ের বিস্তৃত ক্ষেত্র। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পর্কের পেছনে থাকে মানুষ। থাকে সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস, পারস্পরিক আস্থা এবং একে অন্যের প্রতি সম্মান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় জাপানের যেসব রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের অবদান এই বন্ধুত্বের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। তাকাশি হায়াকাওয়া তাদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয়।



