রাতেই অভিযান শুরু হোতাদের ধরতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পোশাকশিল্পে অস্থিরতার নেপথ্য কুশীলব এবং নাশকতাকারীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান শুরুর নির্দেশ এসেছে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে। নাশকতায় জড়িতদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ সেল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও গার্মেন্টস মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রাখছে এই সেল। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সায়েদুর রহমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই সেলের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও পোশাকশ্রমিকদের দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টিতে মদদ দিচ্ছে একটি মহল। দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতেই এমন অপতৎপরতা বলে ধারণা তাদের।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এমন পরিস্থিতি কারও জন্যই সুখকর নয়। যারা এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে, তারা কি দেশের ভালো চায়? তাই আমরা বলব, কারও প্ররোচণায় পা না দিয়ে পোশাকশ্রমিকরা নিজের কাজটি করে যাবেন। অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গত কয়েকদিনের শ্রমিক বিক্ষোভের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এর বাইরেও সংগ্রহ করা হয়েছে অনেক কথোপকথনের অডিও ক্লিপ। এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করা হয়েছে নাশকতাকারীদের। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আনতে দেওয়া হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।
এর বাইরে গতকাল মঙ্গলবার থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে অবস্থান নেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে আলাদাভাবে বসছেন। পোশাককর্মীদের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বোঝাতে তাদের পরামর্শও দিয়েছেন স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। এ ছাড়া শ্রমিক আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ, এসআরবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে রয়েছেন ১০ প্লাটুন বিজিবি এবং জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পোশাককারখানা এবং মহাসড়কের পাশের বিভিন্ন স্থাপনায় স্থাপন করা হয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরাও। পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত পয়েন্টগুলোতে আরও ক্যামেরা স্থাপনের পরামর্শ এসেছে একাধিক সংস্থা থেকে।
জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের নামে একের পর এক নাশকতার ঘটনায় সরকারের শীর্ষ মহলের কাছে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পোশাককারখানার মালিকরা। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গতকাল পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় জেলা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের ৯ সদস্যসহ অন্তত ১১ জন আহত হন। তাদের মধ্যে দুই শ্রমিকও রয়েছেন। একের পর এক সহিংস ঘটনা ঠেকাতে ব্যর্থতায় ‘বেড়ায় ক্ষেত খাচ্ছে কি না’ তা খতিয়ে দেখতে গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে অনুরোধ করেছেন কারখানার মালিকরা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলটির নেতাদের মালিকানাধীন অনেক গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ে মাঠে ছিলেন। তাদের অনেকে বিভিন্ন সময় পুলিশের ওপর চড়াও হন। এসব কারখানার শ্রমিকদের দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টিতে মালিকপক্ষের ইন্ধন ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত কয়েক মাসে দক্ষিণখানের নিপা গার্মেন্টস থেকে শ্রমিকরা একাধিকবার আন্দোলনে নামেন। কারখানাটির মালিক ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক এমপি খসরু চৌধুরী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক। বর্তমান গার্মেন্টসটির পরিচালনায় রয়েছেন খসরু চৌধুরীর খালাতো ভাই পিটু চৌধুরী। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আফিফ আহমেদও খসরু চৌধুরীর নিকটাত্মীয়।
সাবেক এমপি সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন ‘ওলিও অ্যাপারেলস’-এর শ্রমিকরাও বিভিন্ন সময়ে সড়ক অবরোধ করেন। দক্ষিণখানের আকবর টাওয়ার চালাবনের আমব্রেলা অ্যাপারেলস লি.-এর মালিক সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল মজিদ মন্ডল ও তার ছেলে সাবেক এমপি মমিন মন্ডল। তারা পলাতক থাকলেও গার্মেন্টসটি পরিচালনা করছেন শহিদুল ইসলাম জনি নামে একজন। এই গার্মেন্টসটি গাজীপুরে স্থানান্তর নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে উত্তেজনা চলছে। কিছুদিন আগেও টানা এক সপ্তাহ গার্মেন্টসটির ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল একটি গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারা জানালেন, গতকাল রাত থেকে সাঁড়াশি অভিযানে যেতে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পোশাকশ্রমিকদের কারা উসকানি দিচ্ছে, নাশকতায় অংশ নিচ্ছে, পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। নাশকতাকারীদের যারা আশ্রয় দিচ্ছেন তাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বললেন, ‘যারা উসকানি দিচ্ছেন, যারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন, তারা যদি মনে করেন তাদের কেউ দেখছে না, এটা ভুল। আমাদের হাতে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। সবাইকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ সেল থেকে সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানালেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মুনীরা। আগামীর সময়কে বললেন, ‘মালিক এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করছে এই সেল। এখান থেকে দেওয়া হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে সার্বিক নির্দেশনা।’
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকার বলছিলেন, ‘শ্রমিক নামধারী দুর্বৃত্তদের অপতৎপরতা ঠেকাতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ধরনের অপতৎপরতা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে।’



