নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করলে জনগণের যাওয়ার জায়গা থাকে না: জাহেদ উর রহমান

ছবি: আগামীর সময়
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করলে জনগণের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। অনেকেই বিএনপিকে নিয়ে সমালোচনা করে। বলে, বিএনপি শুধু নির্বাচন নির্বাচন করে। আসলে এটা বলে জনগণের ভোটের অধিকার অস্বীকার করা হয়।’
আজ মঙ্গলবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর তৃতীয় পর্ব ‘তিয়াত্তরের নির্বাচন: ভোটচুরির আওয়ামী মডেলের সূচনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তান আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে ভোট কারচুপির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা ধ্বংস করেছিলেন তিনি। তিয়াত্তরের নির্বাচনে তার হারার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তবু তিনি ভোটে কারচুপি করেছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা জানতেন, এমন একটি বিরোধী দল তার সামনে আছে, যাদের সঙ্গে ফেয়ার ইলেকশন করলে তিনি হারবেন। তাই ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি নির্বাচন কুক্ষিগত করেছিলেন। অথচ শেখ মুজিব জিতবেন জেনেও স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনটা নষ্ট করেছিলেন।’
সেমিনারে সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা বলেন, ‘তিয়াত্তরের নির্বাচনে জনপ্রিয়তার কারণেই শেখ মুজিব সরকার গঠন করতে পারতেন। বাকেরগঞ্জ-৪ আসনে তার বিরুদ্ধে জাসদের প্রার্থী ছিলেন আজহার উদ্দিন আহমেদ। শুধু শেখ মুজিবকে জেতানোর জন্য নির্বাচনের আগে জাসদ প্রার্থীকে অপহরণ করা হয় এবং ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে ওই আসনে শেখ মুজিবকে জয়ী করা হয়।’
মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ কুক্ষিগত করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ তিয়াত্তরের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসনই শুধু নয়; বরং এক ব্যক্তির শাসনে দেশ চালাতে চেয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনেও। শেখ মুজিব সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিল, দেশে কোনো বিরোধী দল নেই। আর শেখ হাসিনা প্রচার করে গেছেন, দেশে তার কোনো বিকল্প নেই।’
জুলাই সনদ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আপত্তিগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও জুলাই সনদ স্বাক্ষরের সময় দেখা গেল, নোট অব ডিসেন্টগুলো নেই। দেশের ওই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ায় আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু বিদায়ের সময়ে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া যে জুলাই সনদ করা হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সংসদকে বেঁধে দিতে চেয়েছিল।’
অপর আলোচক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর অনেক কথা শুনেছি। একবার শুনলাম শেখ মুজিবুর রহমান দেশের অভিভাবক হিসেবে রাজনীতিতে অংশ নেবেন না। পরে দেখলাম, তিনি এসে তাজউদ্দীন আহমদকে সরিয়ে সরকারে যুক্ত হলেন। সংবিধান লেখার উদ্যোগ নিলেন। সংবিধানের প্রথম পরীক্ষা ছিল জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনটিই হলো একদলীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ গঠিত হয়েছিল বিরোধী দল ছাড়া, যা গণতন্ত্রের জন্য অসম্মানজনক।’
তিনি বলেন, ‘অনেকেই বলে বঙ্গবন্ধু নিজে এসব করতে বলেন নাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজ দলের লাগাম টেনে ধরতে পারেননি, এটি তার ব্যর্থতা।’
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান অনিবার্য ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দলীয় সরকারে অধীনে কখনোই ভালো নির্বাচন হয়নি। এ কারণেই আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা হয়; যার কারণে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান অনির্বায হয়ে পড়ে। আর একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে।’
অনুষ্ঠানটির সভাপ্রধান ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আমাদের একটি জায়গা করে দিয়েছে, যে জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন স্বর একই মঞ্চে এসে উচ্চারিত হবে। আমরা সবার কথা শুনব, তারপর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্ত নেব, কিন্তু চাপিয়ে দেব না। এটাই আসলে জুলাইয়ের শক্তি। এই ধারাবাহিক আয়োজনের মাধ্যমে আমরা পেছনে ফিরে তাকাতে চাই। আমরা যদি অতীত ভুলে যাই, তাহলে আমাদের সামনের যে অগ্রযাত্রা, আমরা কোথায় যেতে চাই, সেটা পরিষ্কার হবে না।’
বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর একটি অন্ধকার যুগ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি জানি সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখনকার সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কল্পনাও করা যায় না— তখন একটা দেশে শুধু একটি টেলিভিশন ছিল, চারটি দৈনিক পত্রিকা ছিল, তাও আবার সরকার নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ সন্ধ্যাবেলা আপনি যে নিউজ ছাপবেন, সেটা সরকারের প্রেসক্রিপশন করা থাকত।’
‘এখন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে যেকোনো ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে আপনি লাইভ করে দিচ্ছেন, সারা দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে। অর্থাৎ তথ্য গোপনের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা সেই সময়ের কথা, যখন কুমিল্লায় যে নির্বাচন হয়েছে, তার ব্যালট বাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে এবং নিজেদের প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন লেখক ও গবেষক তুহিন খান। এতে অংশ নেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সিরিজটির চতুর্থ পর্ব ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল বুধবার বিকাল ৩টায়, জুলাই জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে।



