দখল দূষণে বিপন্ন কর্ণফুলী নদী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণ হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদী। সড়কপথে উন্নয়নের কারণে যোগাযোগের ক্ষেত্রে হয়তো এই নদী গুরুত্ব হারিয়েছে। কিন্তু বছরে ১১ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় নদীর মোহনায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে। ‘বাণিজ্যের বসতি’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া কর্ণফুলী নদী অনেক দিন ধরে দখল-দূষণে বিপন্ন। কোথাও কোথাও নদীর প্রশস্ততা কমেছে ৩০০-৪০০ মিটার পর্যন্ত। অবৈধ দখলদারের সংখ্যা হাজারের বেশি।
দখলের পাশাপাশি দূষণেও বিপর্যস্ত উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত। মিজোরাম পাহাড় থেকে রাঙামাটি-কাপ্তাই হয়ে আসা নদীর কাপ্তাই অংশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৯৫৬ সালে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ফলে সৃষ্ট রাঙামাটির কাপ্তাই লেকও কর্ণফুলীর অংশ। লেকেও রয়েছে দখলদার। মূল কর্ণফুলী নদী ও কাপ্তাই লেকের দখলদারের তালিকা তৈরি এবং উচ্ছেদের জন্য উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু লোকদেখানো উচ্ছেদের পর তা আর বেশি দূর এগোয় না।
কর্ণফুলী দখল-দূষণ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলছিলেন, ‘উচ্ছেদের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা ছিল। তারা কিছু উচ্ছেদ করেছে। নদীর দুই তীরে পুরোপুরি উচ্ছেদের বিষয়ে আমরা আবার আদালতের নজরে আনব।’
দেখা গেল চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির জেলা প্রশাসনের দখল-দূষণ নিয়ে খুব মাথাব্যথা নেই। গত ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের প্রকৃত মানচিত্র অনুসারে সীমানা জরিপ করে ভেতরে থাকা অবৈধ স্থাপনা মালিকদের নাম-ঠিকানাসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়। কাপ্তাই লেক দখল-সংক্রান্ত চার বছর আগে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিটের ধারাবাহিকতায় দেওয়া হয় এই আদেশ।
তবে তালিকা নিয়ে এখনো কাজ শুরু করেনি জেলা প্রশাসন। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী আগামীর সময়কে বললেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনার কথা শুনেছি; কিন্তু এখনো আদেশ পাইনি। আদেশ হাতে পেলে কথা বলতে পারব।’ এমন বাস্তবতার মধ্যে দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদী দিবস। যার উদ্দেশ্য নদ-নদীর গুরুত্ব তুলে ধরা, নদীদূষণ রোধে সচেতনতা বাড়ানো এবং নদী সংরক্ষণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
দখল ও ভরাটে কমেছে প্রশস্ততা: দখল এবং ভরাটের কারণে রোজই কমছে নদীর প্রশস্ততা। চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন নামের একটি সংগঠন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক এবং বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে ছয় বছর আগে নদীতে একটি জরিপ করেছিল। শাহ আমানত তৃতীয় সেতু থেকে শুরু করে ফিরিঙ্গিবাজার মনোহরখালী খাল পর্যন্ত ছিল জরিপের এলাকা। এরপর আর পরিমাপ-সংক্রান্ত জরিপ হয়নি।
সেই জরিপে দেখা গিয়েছিল, নদীর ব্রিজঘাট এলাকায় ১৯৯০ সালে কর্ণফুলী নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ৯০০ মিটার। চাক্তাই এলাকায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র অনুমোদন এবং তৃতীয় সেতুর নির্মাণের পর নদীর প্রশস্ততা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫১০ মিটারে। ২০১৪ সালে এডিবির পরিমাপ অনুযায়ী, চাক্তাই খালের মুখে প্রস্থ ছিল ৮৯৮ মিটার, পরে কমে হয়েছে ৪৩৬ মিটার।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদের একটি রিটের পর হাইকোর্ট কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন ২০১৬ সালে। এর আগে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন নদীপাড়ের ২ হাজার ১১২টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দিয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং সরকারি-আধা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকেও দখলের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল।
নির্দেশনার চার বছর পর ২০২০ সালে ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। অবশ্য সেটিও মাঝপথে থেমে যায়। ২০২২ সালে ফের অভিযান করে লালদিয়ার চরসহ বেশ কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে তালিকার এক হাজারের বেশি স্থাপনা এখনো উচ্ছেদ করা হয়নি।
বিশেষ করে আদালতের নির্দেশ থাকার পরও কর্ণফুলী ফিশারিঘাট মাছবাজার, বাকলিয়া, কর্ণফুলী তৃতীয় সেতুসংলগ্ন বস্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। বাকলিয়া ও রাজাখালী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর জায়গা দখল করে কাঁচা, সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে গড়ে উঠেছে বসতি ও দোকানপাট। এ ছাড়া মাঝিরঘাট এলাকায়ও কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে। তবে এসব স্থাপনা নিয়ে খুব একটি মাথাব্যথা নেই প্রশাসনেরও।
জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বললেন, ‘আমরা এখন ডেঙ্গু নিয়ে ব্যস্ত। এখনো সীতাকুণ্ডে সচেতনতা প্রোগ্রাম করে আসছি। কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনার বিষয়ে নির্দিষ্ট করে যদি দেখিয়ে দেন আমরা উচ্ছেদ করব।’
জেলা প্রশাসনই অবৈধ তালিকা করেছিল, সেটি স্মরণ করিয়ে দিলে ডিসি বললেন, ‘আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি। ভবিষ্যতেও এসব স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে।’
কাপ্তাই লেক দখল: ২০১৯ সালের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, হ্রদের অবৈধ দখলদারদের তালিকায় পৌরসভার ২২ এবং কাপ্তাইয়ের ৮ জন দখলদারের নাম রয়েছে। তবে এই তালিকার বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা লেকের ভেতরে গড়ে উঠেছে। এগুলোর কথা তালিকায় আসেনি।
এমনকি পৌরসভা, জেলা পরিষদ, জেলা পুলিশের স্থাপনাও রয়েছে লেকে। পুলিশের অফিসার্স মেস ও পুলিশের পলওয়েল পার্ক লেকের মধ্যে হয়েছে। এ ছাড়া রিজার্ভ বাজার এলাকায় জেলা পরিষদের কমিউনিটি সেন্টার, তবলছড়ি এলাকায় ফ্রেন্ডস ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা গড়ে উঠেছে এখানে। রাঙামাটি শহরের পুরনো বাসস্টেশন এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন তিনতলা ভবনও।
১৯৫৬ সালে শুরু হয়ে ১৯৬২ সালে শেষ হয় বাঁধের নির্মাণকাজ। বাঁধের কারণে ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি ডুবে যায়, যা ওই এলাকার কৃষিজমির ৪০ শতাংশ। ডোবে বহু ঘরবাড়িও। রাঙামাটির বরকল উপজেলার বড় হরিণা এলাকার বাংলাদেশ প্রান্ত থেকে লেকের সীমানা শুরু। বর্তমানে লেকের আয়তন ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। এই লেকটি ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশ হয়। বছরে দেড়-দুই লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন এখানে। এ ছাড়া মাছ আহরণ থেকে বছরে অন্তত ১৫ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে সরকার।
রাঙামাটি শহরের সঙ্গে জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে ৬টির যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই লেক। রাঙামাটি লঞ্চমালিক সমিতির হিসাবে, অন্তত এক লাখ মানুষ কাপ্তাই লেকের ওপর নির্ভরশীল।
দূষণ: দখলের পাশাপাশি কর্ণফুলী দূষণের শিকার প্রতিনিয়ত। পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকায় ছোট-বড় শতাধিক সরকারি-বেসরকারি কলকারখানা এবং প্রতিষ্ঠান নদীদূষণের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি শহরের পয়ঃবর্জ্য দূষণে ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালে ৮৫ প্রতিষ্ঠানকে দূষণের জন্য জরিমানা করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতি মাসে নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে পানির নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। জুলাই মাসে নদীর কালুরঘাট ও টিএসপি পয়েন্টে অ্যামোনিয়াম নাইট্রোজেন এবং টোটাল ডিসলভ সলিড (টিডিএস) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ছিল। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে কর্ণফুলী পেপার মিল, কালুরঘাট, শিকলবাহা, মরিয়মনগর এবং সিইউএফএল এলাকায় অ্যামোনিয়াম নাইট্রোজেন, টিডিএস ও ফসফেট গ্রহণযোগ্য মানের মধ্যে ছিল না। সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া যায় নদীর শহরের সঙ্গে সংযুক্ত চাক্তাই, মহেশখাল ও রাজাখালী খালের মুখে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুল হাসান বলছিলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীর দূষণ বেশি হয়। জোয়ার-ভাটা আছে বলে নদীটি বেঁচে আছে।
পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বললেন, ‘বাসিন্দারা নিজেরা পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে। লেকে পড়ে কথাটা সঠিক নয়।’



