আগামীর সময় গোল্ড ক্লাবের বৈঠক, প্রবীণদের পাশে থাকার প্রত্যয়

বুধবার আগামীর সময় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে গোল্ড ক্লাবের প্রথম বৈঠক
দৈনিক আগামীর সময়ের উদ্যোগে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ‘গোল্ড ক্লাব’ নামে গড়ে ওঠা যোগাযোগমঞ্চের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে আগামীর সময় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এ বৈঠক।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গোল্ড ক্লাবের পরিচালক সাইদুজ্জামান রওশন (দন্ত্যস রওশন) ক্লাবের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, ‘এই ক্লাবের উদ্দেশ্য প্রবীণদের একাকীত্ব কমানো, তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে মূল্য দেওয়া এবং সমাজে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। এটি বন্ধুত্ব, মতবিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতার একটি উন্মুক্ত পরিসর।’
সভায় ক্লাবের স্বপ্নদ্রষ্টা ও আগামীর সময় সম্পাদক মোস্তফা মামুন বললেন, ‘অনেক প্রবীণকে আমরা দেখেছি, তারা অসহায়। তাদের পাশে থাকার উদ্দেশ্য নিয়েই গোল্ড ক্লাবটি করা। প্রবীণদের অভিভাবকত্ব আমাদের দরকার। এই ক্লাবের সদস্যরা নিয়মিত মিলনমেলা, আড্ডা ও আলোচনায় জীবনের গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবেন।’
অভিনয়শিল্পী দিলারা জামান বলেন, ‘বুড়ো মানেই শেষ নয়, তারা তো এই সমাজকে মেধা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। প্রবীণদের নিয়ে আগামীর সময়ের এই উদ্যোগ একটি মহৎ কাজ বলে মনে করি। প্রবীণদের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের একটা দূরত্ব আমরা দেখতে পাই। এই দূরত্ব ঘুচাতে গোল্ড ক্লাব কাজ করবে।’ ‘পাশ্চাত্যের অনেক ভালো কিছু আমরা গ্রহণ করেছি, আবার খারাপটাও নিয়েছি। আগে আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল, তা এখন হারিয়ে যাচ্ছে। প্রবীণরা যেন সমাজে অপাঙ্ক্তেয় না হয়ে যান’, যোগ করেন তিনি।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেছেন, ‘আমরা ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রতি বছর মা দিবস ঘটা করে আয়োজন করি। অনেকে জানতে চান, “আশীষ তোমার মা কি তোমার সঙ্গে থাকেন?” আমি বলি— না আমিই আমার মায়ের সঙ্গে থাকি। মা প্রায় সময় খুব অসহায় অনুভব করেন, মৃত্যুচিন্তা ভর করে। তখন তাকে বলি, তোমাকে ১০০ বছর বাঁচতে হবে। আমার মায়ের মতো প্রবীণদের পাশে থাকার এমন উদ্যোগে যুক্ত থাকাটা কর্তব্য মনে করি। গোল্ড ক্লাবের পাশে থাকব, সাধ্য অনুযায়ী যুক্ত থাকব।’
সকলের মূল্যবোধকে জাগ্রত করার আহ্বান জানিয়ে আদিবাসী অধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘গোল্ড ক্লাবের সঙ্গে থাকব। প্রবীণ হলেই কেউ যেন অসহায় না হয়ে তাদের অভিজ্ঞতা সমাজের বিকাশে কাজে লাগাতে পারে।’
সাবেক সিনিয়র সচিব কে এম আব্দুস সালাম বলেন, ‘সামাজিক এ ধরণের কাজে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। বাস্তব নানা পরিস্থিতির কারণেই অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিতে হয়। আশা করি, এটি থামবে না।’
টেবিল টেনিস খেলোয়াড় জোবেরা রহমান লিনু পরামর্শ দেন ক্লাবের উদ্যোগে প্রবীণদের নিয়ে ভ্রমণের আয়োজন করতে। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক প্রবীণদের নিয়ে ক্লাবের কার্যক্রম পরিচালনা করতে। তিনি বলেন, ‘প্রবীণরা তো চলাফেরা করার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেন। তাদের কাছাকাছি আড্ডা দেওয়া বা একত্রিত হওয়ার কিছু আয়োজন করা যায়। এই ক্লাব থেকে ভ্রমণ করার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। যারা আগ্রহী, আমরা একসঙ্গে ঘুরতে যেতে পারি।’
কথাসাহিত্যিক ঝর্ণা রহমান বলেন, ‘প্রত্যেকটা বয়সের মধ্যেই আনন্দ আছে। সেই আনন্দটা উদযাপন করতে হবে। এখন আমরা এমন সময়ে আছি, যখন নবীনরা আর প্রবীণদের সম্মান করছে না। আমরা দেখছি শিক্ষকদের অপমান করছে শিক্ষার্থীরা। এটা বদলাতে এই ক্লাব ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করি।’
গোল্ড ক্লাবের স্পন্সর প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম হোমস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইনুল হাসান দুলন বলেন, ‘এক সময় প্রবীণ বা মুরব্বীদের দেখে আমরা সাইকেল থেকে নেমে যেতাম। তাদের শ্রদ্ধা করতাম। এখনকার প্রজন্মের মাঝে সেই শ্রদ্ধাটা যেন হারিয়ে গেছে। প্রিমিয়ার হোমস এই উদ্যোগের পাশে থাকবে। আমরা সবসময় চেয়েছি প্রবীণদের জন্য কিছু করতে। এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়াটা আমাদের সেই চিন্তারই প্রতিফলন।’
প্রিমিয়াম হোমসের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এজাজুর রহমান সজল বলেন, ‘বাবা-মা বাসায় একা থাকছেন, তাদের পাশে আমাদের থাকাটা জরুরি। সভ্যতা অনেক এগিয়েছে, কিন্তু যখন দেখি উন্নত দেশে প্রবীণ কোনো মানুষ বাসায় একাকী মরে পড়ে থাকছেন। তার মরদেহ সপ্তাহখানেক পর উদ্ধার করা হচ্ছে, তখন আমরা কোন সভ্যতার দিকে যাচ্ছি? আবার যখন দেখি মাকে কাঁধে নিয়ে ১০ কিলোমিটার হেঁটে হাসপাতালে যাচ্ছেন কেউ, তখন আমরা আশা হারাই না। আগামীর সময়ের এই উদ্যোগ আরো এগিয়ে যাক।’
অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয় দৈনিক আগামীর সময়ের প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক আবদুস সাত্তার মিয়াজীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, ‘সবাই হাতে হাত রেখে একসঙ্গে আমরা অনেক দূর যাব। এটাই প্রত্যাশা করি। আমরা চাই নবীনদের কথা বলতে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা সুন্দর আগামী নির্মাণ করতে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আগামীর সময়ের সেলস, মার্কেটিং অ্যান্ড অপারেশন্সের ডিরেক্টর আহসানুজ্জামান রিমন, ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ অ্যান্ড ইভেন্টসের ডেপুটি হেড নাজির হোসেন।
‘প্রবীণ থাকুক সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে’—এই অঙ্গীকারকে সামনে রেখে দৈনিক আগামীর সময়ের গোল্ড ক্লাব মনে করে, বয়স কখনো জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; এটি অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ভালোবাসায় সমৃদ্ধ এক নতুন অধ্যায়। গোল্ড ক্লাব সেই অধ্যায়কে আরও সুন্দর, প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে তুলতে চায়—ভালোবাসায়, সম্মানে, একসঙ্গে।
এর আগে গোল্ড ক্লাবের প্রথম আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে গাইবান্ধায়। ঢাকায় বাবা দিবস উপলক্ষে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়ও আয়োজন করা হয়েছে কার্যক্রম। গোল্ড ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রিমিয়াম হোমস ১২টি অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি ক্লাবের সদস্যদের বিশেষ ছাড়ে ইউনিভার্সেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথাও জানানো হয়।





