রায় হলেও কার্যকর হয়নি কোনো নারীর ফাঁসি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফাঁসির রায় হয়েছে, বছরের পর বছর কেটেছে কারাগারের কনডেম সেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশে ফাঁসির মঞ্চে উঠতে হয়নি কোনো নারী আসামিকে।
স্বাধীনতার পর থেকে শতাধিক নারীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত। তবে দেশে এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার নজির নেই।
ফাঁসি থেকে বাঁচতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের করতে হয়নি রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনও। কিংবা কেউ আবেদন করেছেন, এমন দৃষ্টান্তও নেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী আসামির আবেদন সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে গেলেই দণ্ড কমে হয়ে যায় যাবজ্জীবন। তখন জীবন কাটে ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্মিত কনডেম সেলে।
কেন কার্যকর হয় না নারীদের মৃত্যুদণ্ড? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে আইনি প্রক্রিয়া, বিচারিক ধীরগতি ও বিশেষ মানবিক বিবেচনার নানা তথ্য।
জানা যায়, দেশের একমাত্র নারী কারাগার গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারেও কোনো ফাঁসির মঞ্চ নেই। ২০০৭ সালে কারাগারটি চালু হলেও সেখানে ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের নজির নেই।
কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের কারাগারে বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামি আছেন ৯৪ জন। এর মধ্যে কাশিমপুর কারাগারেই ৫৪ জন। তবে তাদের কারও ফাঁসির রায় কার্যকরের পথে রয়েছে আইনি জটিলতা।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিম্ন আদালতের রায়ের পর আপিলের সুযোগ থাকে আসামির। উচ্চ আদালতে অনেক সময় শাস্তি কমে যায় বা আসামি পেয়ে যান খালাসও। তাই হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ছাড়া কার্যকর হয় না ফাঁসি। নারী আসামিদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ আপিলেই যাবজ্জীবনে রূপান্তরিত হয় ফাঁসির দণ্ড। মামলা থেকে খালাসও পেয়েছেন অনেকে।
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার তানিয়া ফারজানা বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদিদের জন্য আলাদা ভবন থাকলেও রাখা হয়নি ফাঁসির মঞ্চ। কারণ দেশে নারীর ফাঁসির কোনো নজির নেই। যেখানে কোনো নারীর ফাঁসিই হয়নি, সেখানে মঞ্চ তৈরি করবে কেন— তিনি প্রশ্ন তোলেন।
সিলেট ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নারী কয়েদিদের জন্যও নেই আলাদা কনডেম সেল। পুরুষ আসামিদের জন্য থাকলেও তা তৈরি করা হয়নি নারীদের জন্য। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না অন্তঃসত্ত্বা নারীর। এ ছাড়া বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণেও স্থগিত করা হয় ফাঁসি।
কারা সূত্র জানায়, বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আসামি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার আসামি কামরুন্নাহার মণি ও উম্মে সুলতানা পপি, ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী হত্যা মামলার দুই আসামি রীতা আক্তার ও রুমা ওরফে রেশমা এবং মা-বাবা হত্যা মামলায় দণ্ডিত ঐশী রহমানসহ আরও অনেকে। তাদের বেশিরভাগের মামলাই বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় শিথিলতা রয়েছে নারী আসামিদের জামিনে। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে নারীদের মামলার নিষ্পত্তি হতে বছর পেরিয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থার চাপও আরও তীব্র হয় নারীদের ক্ষেত্রে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফ জামিলের মতে, নারীদের ফাঁসি কার্যকরে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, আপিলে সাজা হ্রাস, সামাজিক বাস্তবতা এবং বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর পর্যন্ত বিষয়টি পৌঁছায় না।
এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নারীর ফাঁসি কার্যকরের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দেশের আলোচিত আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ২০২৪ বছরের আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশর ইতিহাসে ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে একজন মাত্র নারীর। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমি আবেদন করেছি কারা মহা অধিদপ্তরের কাছে।’ এ সময় সেই তথ্য এখনো পাননি বলেও জানান তিনি।
কনডেম সেল কী
কনডেম সেল হলো কারাগারের সেই বিশেষ কক্ষ বা আবাসন, যেখানে শুধু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের রাখা হয়। বাংলাদেশে কনডেম সেল বলতে সবসময় আলাদা কোনো নির্দিষ্ট কক্ষ বোঝায় না। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব বন্দির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং যাদের মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বা রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এই পৃথক আবাসনই হচ্ছে কনডেম সেল।
প্রতিবেশী ভারতে নারীর ফাঁসি!
ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার নিশ্চিত নজির নেই। তবে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা শবনমকে মৃত্যুদণ্ড দেন দেশটির আদালত। ২০০৮ সালে প্রেমিকের সঙ্গে মিলে বাবা-মা, দুই ভাই, ভাবি এবং মাত্র নয় মাস বয়সী এক শিশুসহ পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যা করেন তিনি। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। রাষ্ট্রপতির কাছেও ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন খারিজ হয়।
শবনমের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি হিসেবে উত্তর প্রদেশের মথুরা কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। তবে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে আজও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।
ফলে স্বাধীনতার পর ভারতেও এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকরের নজির প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে শবনমের মামলাটি দেশটিতে নারী মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইরানে নারী মৃত্যুদণ্ডের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আব্দর রহমান বোরোমান্ড সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রয়া বোরোমান্ড জানিয়েছেন, ইরানের আইন অনুযায়ী খুনের অপরাধে কারাদণ্ডের পরিবর্তে সাধারণত দুটি পথ খোলা থাকে। ভুক্তভোগীর পরিবার ক্ষমা করে দিতে পারে অথবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
রয়া বোরোমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অন্তত ২৩৩ জন নারীর মৃত্যুদণ্ডের তথ্য নথিভুক্ত করেছে তাদের সংস্থা। এর মধ্যে ১০৬ জনকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে এবং ৯৬ জনকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অল্পসংখ্যক নারীকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কসংক্রান্ত অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।




