স্কুলে কমছে শিক্ষার্থী, মাদ্রাসায় বাড়ছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় দেশের শিক্ষার প্রধান ভরসা ছিল সাধারণ স্কুল। সময়ের সঙ্গে সেই চেনা চিত্রে বদল আসছে। দেশের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে যখন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, তখন উল্টো চিত্র মাদ্রাসায়— সেখানে বাড়ছে শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ বলছে, ২০১৯-২৫ সালের মধ্যে মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী কমেছে ১৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। একই সময়ে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলেও দেখা গেছে সামান্য প্রবৃদ্ধি।
কেন বদলে যাচ্ছে শিক্ষার এই চেনা সমীকরণ? শিক্ষাবিদদের মতে, সাধারণ শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে অসন্তোষ, পরিবারের আর্থিক সংকট, মাদ্রাসায় কম খরচে পড়াশোনা ও আবাসিক সুবিধা এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও শিক্ষক বাড়লেও স্কুলে শিক্ষার্থী কমার এ প্রবণতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান, সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস)। সেখানে কভিডের পর স্কুল থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ার তথ্য মিলেছে। শিক্ষা পরিসংখ্যান বলছে, এ ধারা শুধু সাত বছরের নয়, ২০১৮ সালের পর থেকে স্কুলে শিক্ষার্থী কমতে শুরু করে।
সাত বছরে স্কুল থেকে উধাও ১৭ লাখ
মাদ্রাসায় বাড়ল ২২ হাজার
ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা শুরুর বছর ২০১৯ সালে মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৩ লাখ ৯ হাজার ৩২৩; যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজার ৪১৬ জনে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে মোট শিক্ষার্থী কমেছে ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৯০৭ জন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ কম। সবচেয়ে বেশি কমেছে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে, ওই বছর ৭ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৮ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। একই সময়ে মাদ্রাসার চিত্র ছিল উল্টো। দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল— এই চার স্তরে ২০১৯ সালে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৩৮ লাখ ৬ হাজার ৩৩৬, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ২০ জনে। অর্থাৎ এ সময়ে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৬৮৪ জন, যা শতাংশের হিসাবে ১১ দশমিক ৫৮। এর মধ্যে দাখিলে (এসএসসি) বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৯৯, আলিমে (এইচএসসি) ৭২ হাজার ৬০৯, ফাজিল (ডিগ্রি) ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৯ এবং কামিলে (মাস্টার্স) ১ লাখ ৯ হাজার ২৯৭ জন। তার আগে ২০০৩ সাল থেকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৩ সালে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৭ জন। ২০২৫ সালে এসে মোট শিক্ষার্থী হয়েছে ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ২০ জন। এ সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থী বেড়েছে ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
তিন দশকের গতিপ্রকৃতি (১৯৯৫-২০২৫)
মাধ্যমিক শিক্ষার তিন দশকের (১৯৯৫-২০২৫) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সময়ে মাধ্যমিক শিক্ষায় বৃদ্ধি, স্থবিরতা ও পতন— এ তিনটি ভিন্ন সময়কাল অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ১৯৯৫-২০০২ সালে মাধ্যমিক শিক্ষার উত্থান বলা হয়। ১৯৯৫ সালে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ছিল ৫১ লাখ ১৫ হাজার। যার মধ্যে মেয়ে ছিল ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ২০০২ সালের সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ লাখ ৬২ হাজারে। মেয়েদের ভর্তি ছিল ৫৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০০৩-১৮ সময়ে কিছুটা স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায়। ২০০৪-০৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যায় ওঠানামা দেখা গেলেও ২০০৮ সাল থেকে শিক্ষার্থী কমতে শুরু করে। ওই বছর মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৮ লাখ ১৯ হাজার। তারপর ২০০৯ সাল থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়তে থাকে এবং ২০১৮ সালে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ কোটি ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারীর পর মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে, যা ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ৯৪ লাখ ৫ হাজারে, ২০২৪ সালে ৯০ লাখ ৬৩ হাজারে এবং ২০২৫ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারে। এই এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজার।
অন্যদিকে, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেড়েছে। দেশে এ ধরনের স্কুল রয়েছে ১৪৩টি। ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৭৭, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৬৭২ জন।
শিক্ষার্থী কমলেও বাড়ছে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনের ইতিবাচক দিক, নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ ও অবকাঠামোগত প্রসার। ১৯৯৫ সালে যেখানে নারী শিক্ষক ছিলেন মাত্র ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশে। একই সঙ্গে মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ১২ হাজার ১২টি থেকে বেড়ে ২১ হাজার ৩১৪টি এবং শিক্ষক সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৪ হাজারে উন্নীত হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ আগামীর সময়কে বলেছেন, বিষয়টিকে শুধু দারিদ্র্য বা আর্থিক সাশ্রয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী কমার পেছনে মূল কারণ সাধারণ শিক্ষার গুণগত মানের অভাব, বারবার কারিকুলাম ও শিখন পদ্ধতির ধারাবাহিক অস্থিরতা। করোনার পর স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার মতো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনামূলক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, অভিভাবকরা যখন দেখেন স্কুলে পড়াশোনার বড় খরচের পরও শিখনফল পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তারা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। শুধু অবকাঠামো বা শিক্ষক সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না; মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক তদারকি ও গুণগত মানের আমূল পরিবর্তন না আনলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এ ধারা ঠেকানো সম্ভব নয়।
যদিও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার ব্যাপারে ব্যানবেইস কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, কভিডের পর মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম অর্থনৈতিক সংকট ও বাল্যবিয়ে। কভিডের সময় পরিবারগুলোর আয় কমে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে কাজে যোগ দিতে হয়েছে। জনমিতিক পরিবর্তন বা জন্মহার হ্রাস পাওয়ার কারণেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিশুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমছে বলে মনে করছেন তারা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভিসি ও শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মাদ্রাসায় পড়াশোনা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় সেখানে ভর্তির প্রবণতা বেড়েছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির অনুদানে পরিচালিত অনেক মাদ্রাসায় লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছে। তবে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়লেও স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং ঝরে পড়া রোধে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মত তার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, গত এক দশকে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসায় বেড়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। বিশেষ করে করোনা মহামারীর পর মাদ্রাসাগুলোতে অনুদান বেড়েছে, যার সরাসরি সুফলধারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া স্কুলের তুলনায় মাদ্রাসায় স্বল্প খরচে কিংবা লিল্লাহ বোর্ডিং ও আবাসিক সুবিধায় পড়াশোনার সুযোগ থাকায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, অভিভাবকদের মধ্যে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের প্রবণতা বেড়েছে, যার ফলেও মাদ্রাসায় ভর্তির হার বেড়েছে।



