স্বর্ণচাঁপার সুবাসে স্বর্ণের গল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায়ই রংপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছুটি প্রাণপ্রকৃতির টানে। কলেজের চেয়েও হাসপাতাল চত্বরের সবুজটা অন্যরকম। বছর দু-এক আগে রংপুর মেডিকেল কলেজের ১৬তম ব্যাচের পুনর্মিলনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘সুবাসিত সন্ধ্যায়’ অংশগ্রহণ করতে এসেছিল মেডিকেল কলেজের ওই ব্যাচের সাবেক ছাত্র বাংলা একাডেমির পরিচালক ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম লাবীনের নেতৃত্বে বাংলা একাডেমির সাংস্কৃতিক দল। প্রকৃতিপাগল ডা. লাবীন চেয়েছিলেন, তার গ্রন্থনা আর উপস্থাপনায় কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মীর পারফরম্যান্স স্মৃতির পাতায় রয়ে যাক। অপেক্ষা করছিলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির সাক্ষী হতে কলেজ ভবনের ঐতিহাসিক শহীদ রফিক মিলনায়তনের বাইরে।
অমর একুশে বইমেলা শেষে এক কি দুদিন পর-গাঢ় সন্ধ্যা তখন। ডাক্তারদের প্রধান আইডেন্টিটি স্টেথোসকোপ গলায় ঝুলিয়ে এবং অ্যাপ্রোনের পকেটে ঢুকিয়ে স্টেজের দিকে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছিল কেউ কেউ। আচমকা কাঁধে কালো ব্যাগ আর আপ্রোন পরা মেয়ে প্রায় চমকে সালাম আর কুশল জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলাম ‘আরে স্বর্ণ, তুমি!’ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ানোতেই বুঝে নিতে কষ্ট হলো না ও থার্ড ইয়ারে উঠে গেছে। হাতে-কলমে শিখতে হাসপাতালের ওয়ার্ড ক্লাসে সকাল-সন্ধ্যা যেতে হচ্ছে। মাগরিবের পরপরই তাই ইভেনিং ওয়ার্ডে যাওয়ার আগে এসেছিল স্টেজের আপডেট জানতে।
মেডিকেল কলেজের কাছেই রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ। মেয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার খাতা দেখাবে। অফিস থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে মেয়েকে নির্ধারিত সময়ে সকাল ৮টায় স্কুলে নামিয়ে সোজা ছুটলাম ওদের ক্যাম্পাসে। চোখে পড়ল বেশ কয়েকটি স্বর্ণচাঁপাগাছ ফুলসহ। যদিও প্রথম দেখা হয়েছিল রংপুরের ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল রোড অগ্রণী ব্যাংকের গলির শেষ মাথায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী জগদীশ প্রসাদের হলুদ রঙের অ্যান্টিক চারতলা বাড়িটির মূল ফটকে। ও বাড়ির ছোট ছেলে বিলাস প্রসাদ জানিয়েছিলেন, আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে তার মা স্বর্ণচাঁপার চারা লাগিয়েছিলেন। রংপুরে চোখে পড়ে আরেকটি স্বর্ণচাঁপাগাছ ভেঙে ফেলা ঐতিহাসিক পুলিশ হলের সামনে সহজ কথায় রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের ঠিক উল্টোদিকে এখন যেখানে রংপুর পুলিশ পার্ক।
হিমালয় পাহাড়ের পাদদেশে প্রচুর পরিমাণে জন্মালেও উজ্জ্বল নজরকাড়া রঙ আর স্নিগ্ধ সৌরভের কারণে জনপ্রিয় ফুলের তালিকায় থাকা স্বর্ণচাঁপা ফুলগাছটির প্রতি ভ্রমর খুব একটা আকৃষ্ট হয় না। কারণ এর রস তেতো। গাছের ছাল শুকিয়ে চিবালে তেতো স্বাদটি টের পাওয়া যায়। উচ্চতা সাধারণত ৩০-৪০ ফুট হয়ে থাকে। পছন্দ করে উঁচু জমি। গাছের গোড়ায় পানি জমা একদমই সহ্য করতে পারে না। ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। গাছটির তারুণ্যে দেখতে পিরামিডের মতো।
শীতে পাতা ঝরতে শুরু করলেও গাছ একেবারে পাতাশূন্য হয় না। মার্চ-এপ্রিল মাসে ফুল ফুটতে শুরু করে, এমনকি নভেম্বর পর্যন্তও ফুল চোখে পড়ে, তবে খুবই কম। পাতা চ্যাপ্টা এবং উজ্জ্বল সবুজ ও খসখসে। সোনালি রঙের ফুল দেখতে অনেকটা কাঁঠালিচাঁপার মতো আবার কোনো কোনো গাছের ফুল সাদাও হয়।
২০১৬ সালে আশরাফিয়া বইঘর থেকে প্রকাশিত দি রয়েল পাবলিশার্স পরিবেশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক খ্যাতিমান উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আবুল হাসানের লেখা ‘পবিত্র উদ্ভিদগুলো’ (Sacred Plants) বইয়ের ‘স্বর্ণচাঁপা’ অধ্যায়টিতে পাওয়া যায়, ‘ফুলের কাই কুষ্ঠ নিবারক ও পাঁচড়ায় উত্তম ওষুধ। এর ক্বাথ অগ্নিমন্দা, বমি ও জ্বরে উপকারী। চাঁপা ফুল বেটে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে মাখলে মাথা ধরা উপশম হয়। বাকলের ক্বাথ গবাদি পশুর বিষাক্ত ঘায়ে ব্যবহার করা হয়। চাঁপা ফুল থেকে হলুদ রঙ নিষ্কাশন করে কাপড় রঙ করা হয়। কাণ্ডের বাকলের গুঁড়ো হাঁপানি উপশম করে। পাতার ক্বাথের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে পেটব্যথার উপশম হয়।’ ফুল শেষ হলে গুচ্ছবদ্ধ ফল ধরে থোকায় থোকায় অনেকটা আঙুরের মতো। প্রতিটি ফলে চারটি পর্যন্ত বীজ থাকতে পারে। বীজ গাঢ় বাদামি বা কালো রঙের। কাক ও শালিকের ভীষণ পছন্দ। বীজ ছাড়াও গুটিকলমে চাষ সম্ভব।
ইংরেজি নাম Golden Champaca উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Michelia Champaca পরিবার Magnoliaceae. চাঁপার রয়েছে অনেকগুলো প্রজাতি। প্রধান উল্লেখযোগ্য প্রজাতি স্বর্ণচাঁপা ও হিমচাঁপা।
লেখা: কৃষিবিদ ও গবেষক



