বাংলাদেশের নকশিপাখা

সংস্কৃতি
লোকসাহিত্য আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ, যা সহজেই আমাদের মনের কথা বলে। বাংলাদেশের লোকজীবন বড় বিচিত্র। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছড়া, লোককাহিনি ও লোকশিল্প থেকে আমাদের সমাজজীবন এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। এগুলো মানুষের যথাযথ পরিচয়ের জন্য ভাব এবং চিন্তার খোরাক। যাতে করে ফুটে ওঠে লোকায়ত
বাংলাদেশের সার্থক প্রতিচ্ছবি।
বাংলা লোকশিল্পের মধ্যে লোকসাহিত্যেরই বীজ নিহিত। এ শিল্পের মূল শিকড় হাজার বছর আগে প্রোথিত হয়েছিল এ দেশেরই মাটিতে, যা নানান দেশের লোক ঐতিহ্য ও লোক-সংস্কৃতিতে আজও ধারণ করে আছে। কালপ্রবাহে বর্তমানে
এগুলো জিইয়ে রয়েছে আমাদের লোকসাহিত্যে লোকজ শিল্পকলায়।
আর লোকসাহিত্য সামাজিক সৃষ্টি এবং এ কারণেই এটি সমাজের কথা বলে। তাদের সৃষ্টি জনগণ দ্বারা, জনগণই তাদের লালন করে। আবার জনগণই লোকসাহিত্যকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বহন করে। এ নিরিখে আমরা আমাদের লোকায়ত বাংলাদেশ সিরিজে নিবেদন করছি— লোকসাহিত্যে বাংলাদেশের লোকায়ত শিল্পকলা। এ পর্যায়ে আজ আমরা পরিবেশন করব ‘বাংলাদেশের নকশিপাখা শিল্প।’
সত্যি কথা বলতে, শুরুতেই বাংলাদেশের লোকায়ত পাখাশিল্প সম্পর্কে বলতে গেলে লোক কবির ভাষায় বলতে হয়:
‘শীতে তুমি লুকিয়ে থাক গরমে দাও দেখা,
আদর করে নাম রেখেছি তাই তো তোমার পাখা’
কোনো এক অখ্যাত-অজ্ঞাত গ্রাম্য কবির এই সরল বাণীটি আজও বুকে ধারণ করে আছে বাংলাদেশের নকশিপাখা শিল্প। আসলেও তাই, শীতে পাখা লুকিয়ে থাকে একান্ত অবহেলায়, শীতে প্রয়োজন কাঁথার। আর শীতে যেমন কাঁথা, গরমে তেমনি পাখা। তাই শীতের পরে গরমের মতোই কাঁথার পরে পাখা।
বাংলাদেশের কাঁথাশিল্প প্রকরণ-উপকরণ বৈশিষ্ট্যে দুই রকমের— সুতার আর বেতের পাখা। চাকের প্রেক্ষাপটে সুচের সাহায্যে পুরনো বস্ত্র-জাত সুতার বুনন কৌশলে সুতার পাখার শিল্পরূপ বিন্যস্ত। তবে নতুন কাপড় চাকে মুড়ে তার ওপর রুমালের মতো নতুন সুতার নকশা তুলেও অনেক সময় পাখা তৈরি হয়। বুনন বৈশিষ্ট্যে সুতার পাখার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও বাঁশ-বেত অথবা তালপাতার পাখার শিল্পায়ন বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। বাঁশের ফালি থেকে অভ্যস্ত হাতের কৌশলে তৈরি হয় সূক্ষ্ম বেতি। সেই বেতি মসৃণ করে চেঁচে অথবা তালপাতা ফালি ফালি করে চিরে বুননের কৌশলে তৈরি হয় পাখা। তালপাতার বোনা পাখায় রঙের ব্যবহার সীমিত। বিশিষ্ট বুনন-কৌশলের মধ্যেই এর শিল্পরূপ বিন্যস্ত। বাঁশ-বেতের পাখায় বেতিগুলো বিচিত্র রঙে রাঙিয়ে বুননের কৌশলে এবং বর্ণ সম্পাতের বৈচিত্র্যে তৈরি হয় নকশা। সুপারির খোলেও পাখা তৈরি হয়। তবে ময়ূরপুচ্ছ নির্মিত পাখায় স্বতন্ত্র নকশার প্রয়োজন হয় না।
পাখার চিত্র বা নকশা আল্পনাচিত্র প্রভাবিত। কিন্তু পাখার সীমিত পরিসরে চিত্র বা নকশা বৈচিত্র্যের অবকাশ কম। তাই পাখায় সাধারণত লতা মণ্ডন সম্ভব হয় না। সচরাচর পাখার নকশায় থাকে তারা ফুল, ছিটা ফুল, পাখি (একই ধরনের দুটি পাখি মুখোমুখি অবস্থান করলে বলে ‘ভালোবাসা’) গাছ (প্রধানত কদমগাছ), পাতা (অধিকাংশ পানপাতা), মাছ, হাতি, মানুষ, গম্বুজ ইত্যাদি। লেখা পাখায় সাধারণত চিত্র থাকে না। বেতের পাখায় পালংপোষ, পাশার দান, ঘোষগুটির ঘর, বাঘবন্দি ইত্যাদি নকশা মুদ্রিত হয়। চিত্ররূপ অনুযায়ী বিভিন্ন নামকরণ করা হয়। যেমন— ভালোবাসা কাঁকইর জালা, গুয়াপাতা, পালংপোষ, সুজনি ফুল, বলদের চোখ, শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, ছিটাফুল, তারাফুল, মনবিলাসী, মনবাহার, মনসুন্দরী, বাঘবন্দি, ষোল কড়ির ঘর, সাগরদীঘি, হাতি, ফুল, মানুষ ইত্যাদি।
বাংলা একাডেমির লোকশিল্প সংগ্রহে বিভিন্ন নামের নকশিপাখা রক্ষিত আছে। পাখাগুলো কিশোরগঞ্জ ও সিলেট থেকে সংগৃহীত হয়েছে। পাখাগুলোর পরিচিতপত্রে তার উল্লেখ আছে। প্রকারভেদ অনুযায়ী তার উল্লেখ করা যায়:
সুতার তৈরি: শঙ্খলতা, সুজনি ফুল, বলদের চোখ, সাগরদীঘি।
বাঁশের তৈরি: গুয়াপাতা, তারাফুল, ছিটাফুল, কাঁকইর জালা, ভালোবাসা, গম্বুজ-তোলা, হাতি-ফুল-মানুষ, লেখা।
বেতের তৈরি: পালংপোষ, পাশার দান।
কিশোরগঞ্জ অঞ্চল থেকে সংগৃহীত একটি মেয়েলি গীতে পাখার বর্ণনা পাওয়া যায় এভাবে—
‘সেই না পাংখাত লেইখা গো থইছে
আঁসা আঁসির জোড়া গো।
সেই না পাংখাত লেইখা গো থইছে
মউরা মউরীর জোড়া গো।’
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের নকশিপাখা শিল্পে বিধৃত হয়েছে বাংলাদেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিক ইতিহাস, জীবনাচরণ ও ঐতিহ্য, যা আমাদের লোকায়ত বাংলাদেশের চিরায়ত সম্পদ ও সম্পত্তি। যাতে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে লোকায়ত বাংলাদেশের মুখ। খুঁজে ফিরি আমাদের বাংলাদেশের চিরচেনা সচল ও সজীব প্রতিকৃতি।



