অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
কাব্য-সঙ্গোপনের অলোকরঞ্জিতা

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (৬ অক্টোবর ১৯৩৩ — ১৭ নভেম্বর ২০২০)
কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, তাঁকে দেখার চেয়ে বড় দেখা হলো কবিতার ভেতর দিয়ে তাঁকে খুঁজে পাওয়া। কারণ কবি তো শরীরে বাঁচেন না, বাঁচেন তাঁর সৃষ্ট-কবিতায়। অলোকরঞ্জনের সৃষ্টি এত বিচিত্র, এত বহুকেন্দ্রিক যে তাঁর সমগ্র জীবনটাই যেন ছড়িয়ে আছে ছন্দে, শব্দে, ইমেজে, নীরব প্রতিবাদে আর মানুষের জন্য অফুরান ভালোবাসায়। তাঁর জীবনটা যদি পরতে পরতে খুলে দেখি, তবে দেখা যাবে—প্রতিটি পরতের নিচে লুকিয়ে আছে এক নতুন অলোকরঞ্জন, যিনি কখনো বাউল, কখনো বিদ্রোহী, কখনো প্রবাসী, কখনো আবার শেকড়-সন্ধানী।
১৯৩৩ সালের ৬ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অলোকরঞ্জন। কিন্তু তাঁর শৈশব কেটেছে সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায়। সেই রিখিয়ার সহজ মানুষ, মায়াঘন প্রকৃতি, পাহাড়ের নীল আকাশ— সবই তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রিখিয়ার দেহাতি বালক বুধুয়ার চোখ দিয়ে তিনি দেখেছেন সেই অপরূপ প্রকৃতিকে। বুধুয়ার সরল চোখে ভরে দিয়েছেন নিজের অন্তরে উপচে ওঠা অবাক বিস্ময়। ‘বুধুয়ার পাখি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘ঝাঁকে-ঝাকে পাখি আসে, কেউ তার দিদি, কেউ মাসি/ রুপোলি ডানায় যারা নিয়ে যায় বুধুয়ার হাসি।’ এই সহজ সরল ছবির ভেতর দিয়ে ফুটে ওঠে এক গভীর জীবনদর্শন—যেখানে মানুষ, প্রকৃতি আর স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রিখিয়ার সেই শিকড় তাঁকে আজীবন আঁকড়ে রেখেছে। জার্মানিতে বসে যখন তিনি লিখেছেন ‘নির্বাসন’ কবিতা, তখন সেই শিকড়ের টানই তাঁকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে মায়ের শৈশবে, দেশগাঁয়ের পাহাড়ে, ঝর্নায়।
শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা তাঁর জীবনের এক বড় বাঁক। বিশ্বভারতীর সেই পরিবেশে তিনি পেয়েছিলেন একটা বৈশ্বিক চেতনার অনুধাবন। তিনি নিজেই বলেছেন: ‘যখন বিশ্বভারতীতে পড়তাম, তখন যে বিশ্বটা আমার মধ্যে ছিল, সে-বিশ্বের কোনো জাতীয়তার বিভাজন ছিল না।’ সেই বিশ্বকিশোর কমপ্লেক্স তাঁকে আজীবন তাড়া করেছে। শান্তিনিকেতনে সহপাঠী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তিনি প্রকাশ করেছিলেন ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে একটি পত্রিকা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর এক দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল বাউল গানের প্রতি। লোকসংগীত, ভাটিয়ালি, সাঁওতালি সুরে মেতে থাকতেন। বাউল গান ছিল তাঁর জীবনীশক্তি। সেই বাউলসত্তার বীজ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহীরুহে পরিণত হয়েছিল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামই ‘যৌবনবাউল’। এই নামটিই তাঁর কাব্যদর্শনের একপ্রকারের ঘোষণা।
কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর ডক্টরেটের বিষয় ছিল ‘ভারতীয় লিরিক রূপকল্পের উৎস ও ক্রমবিবর্তন’। ১৯৫৭ সালে তিনি যোগ দেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে। এই বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। এখানেই বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষকে। বৈদগ্ধ্য, জ্ঞানান্বেষণ, সাহিত্য বিশ্লেষণ ও অন্বেষা অলোকরঞ্জনকে অধ্যাপনাতেও খ্যাতি এনে দিয়েছিল। লেখালেখির সূচনাকাল থেকেই তাঁর কবিতায় কথোপকথনে এক নিজস্ব আদল তৈরি হয়। তাঁর কবিতা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে তখনকার উল্লেখযোগ্য কবিতাপত্র আলোক সরকার সম্পাদিত ‘শতভিষা’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’-এ। দুটি পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য অলোকরঞ্জনের কবিতা প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি পরে বলেছেন: ‘কৃত্তিবাস’-এর ব্যাপারটাই ছিল চারপাশের প্রথাময়তাকে আঘাত করা, আর ‘শতভিষা’র ব্যাপার ছিল, প্রথার মধ্যে যা কিছু সংরক্ষণযোগ্য, তাকে তুলে আনা… আমার ওপর ‘কৃত্তিবাস’ বা ‘শতভিষা’ কোনো দিক থেকেই সেন্সর ছিল না।’
এরপর আলেক্সান্ডার ফন হুমবোল্ট রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে তিনি পশ্চিম জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারততত্ত্ব বিষয়ে ১৯৭১ থেকে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সূত্রেই পাঁচ দশক ধরে হাইডেলবার্গের বাসিন্দা ছিলেন অলোকরঞ্জন। কিন্তু কখনও কলকাতা ও কলকাতার সাহিত্যজগৎ থেকে দূরে যাননি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতিটি বিষয়ে ছিল তাঁর অসীম আগ্রহ। জার্মানিতে বসে তিনি অনুবাদ করেছেন হাইনে, রিলকে, ব্রেশট, সুরদাসকে। বাংলা কবিতাকে পৌঁছে দিয়েছেন জার্মান পাঠকের কাছে। পূর্ণদাস বাউলের ১২টি গান তিনি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। সমালোচকেরা তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ‘আধুনিক বাউল’ বলে, যিনি বাংলার লোকতত্ত্বকে বিশ্বসাহিত্যের পরিসরে টেনে এনে নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন।
অলোকরঞ্জনের কবিতার আত্মা খুঁজতে গেলে প্রথমেই যেতে হয় বাউলসত্তার কাছে। বাউল মানে শুধু গান নয়, বাউল মানে দেহতত্ত্ব, আত্ম-অন্বেষণ, মুক্তি, ভ্রমণ। ‘যৌবনবাউল’-এ আমরা দেখতে পাই মরণমদ মাতাল ডোম, জয়শ্রী জীবন, রুচিরাক্ষমালা, দারিদ্রধূসর ধানখেত, ধ্যান ধবলিমা, কান্না কীর্তনীয়াদের। কবির কাছে বাউলসত্তা মানে শুধু লোকসংগীতের অনুরণন নয়, বরং দেহতত্ত্ব, আত্ম-অন্বেষণ, ভ্রমণ ও মুক্তির এক বিশেষ মিশ্রণ। তাঁর কবিতায় দেহকে দেখা যায় এক গোপন গ্রন্থাগারের মতো, যেখানে মৃত্যু ও জীবনের লীলাখেলা মিলেমিশে যায়। তিনি লিখেছেন: ‘মরণ মদমাতাল ডোম/ সবি করুক উপশম/ শ্মশানে, আমি জীবন ছাড়বো না।’ ‘যৌবনবাউল’-এর ‘বিভাব’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন: ‘একটি মাত্র রাখাল যাক,/ এ মাঠ একলা পড়ে থাক/ নীরবে, আমি এ মাঠ ছাড়বো না।’ ছাড়েননি। আমৃত্যু তিনি এই সাধনাতেই ছিলেন অপরিক্লান্ত অপরিশ্রান্ত।
এই বাউল-প্রীতির সঙ্গে মিশে আছে এক গভীর রোমান্টিক আধ্যাত্মিকতা। তাঁর ‘এক উদাসীন পান্থ’ কবিতায় আমরা দেখি অন্ধকার থেকে অন্ধকারে যাওয়ার যাত্রা, প্রাণের আনন্দের কাছে আত্মসমর্পণ, আর নন্দন পাহাড়ের ঘন রাতের বর্ণনা। কবি লিখছেন: ‘অন্ধকার থেকে অন্ধকারে/ প্রাণের আনন্দ যাও, প্রাণের আনন্দ,/ আমি একা, নাও গো আমারে।’ এই আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে ফুটে ওঠে এক গভীর নিঃসঙ্গতা, যা কেবল বাউলসাধকের নয়, প্রেমিকেরও। কবিতার শেষে সেই ‘উদাসীন পান্থ’ উঠে যায় নন্দন পাহাড়ে, রেখে যায় প্রাণের আনন্দ আর প্রেমিকাকে। এই উদাসীন পান্থ যেন স্বয়ং কবি—যিনি সারাজীবন পাহাড় থেকে পাহাড়ে, দেশ থেকে দেশে, সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিতে ভ্রমণ করেছেন, খুঁজেছেন সেই ‘ঈশ্বরী’-কে, যিনি ‘এখনো আঁধারে অরূপা’। এই কবিতার ভেতর দিয়ে আমরা অলোকরঞ্জনের ভ্রমণসত্তার প্রথম আভাস পাই—যে ভ্রমণ কেবল ভৌগোলিক নয়, অপার আধ্যাত্মিক।
‘যৌবনবাউল’ থেকে ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’ (১৯৬৭) হয়ে ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ (১৯৬৯) পর্যন্ত যেন একটি পর্যায়। ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’-তে বদল এতটাই যে, এই কবি এবং যৌবনবাউলের কবিকে এক বলে বিদেশি কোনো মননশীল পাঠক ধরতেও পারবেন না। ঈশ্বরবিশ্বাসী অলোকরঞ্জন এখানে প্রণিপাত করেছেন মানুষের দরবারে। অকুণ্ঠ বিশ্বাসে বলেন— ‘যেদিকে ফেরাও উট, এই দ্যাখো করপুটে একটি গণ্ডুষ/ বিশ্বাসের জল, তুমি পান করো, আমি জল না খেয়ে মরব।’ এখানে তিনি বলিষ্ঠ জীবনবাদী। ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক স্বতন্ত্রচিহ্নিত বিস্ময়। এই কাব্যগ্রন্থের পশ্চাদভূমি অলোকরঞ্জনেরই এক শ্রুতিলিখনে কীর্ণ হয়েছে চিরকালের ভাষায়: ‘শান্তিনিকেতনে ছাত্রদশাতেই মার্ক্সবাদে অকালদীক্ষিত হয়ে পড়ি… কার্ল মার্ক্সের সৌন্দর্যতত্ত্ব নিয়ে একটি লেখায় হাত দিয়েছি শুনে ছাত্র ফেডারেশনের কর্মীরা আমায় এই বলে ধিক্কার দেয় যে, নন্দনতত্ত্ব কার্ল মার্ক্সের এলাকা-বহির্ভূত।’এই পর্যায়ে এসে তাঁর কবিতায় প্রেম, বিরহ, স্মৃতি আর হারানোর বেদনা এক নতুন মাত্রা নিয়ে হাজির হয়। ‘চিহ্ন’ কবিতায় তিনি লিখছেন: ‘সারাটা পৃথিবী তুমি রেখে গেছ স্মৃতিচিহ্ন করে;/ আমি ভয়েভয়ে থাকি, যদি কেউ করে নেয় চুরি।’ এই কবিতায় প্রেমিকা এখানে এক বিস্মৃত নীলিমায় ভাসা চন্দনার শিশু, এক সংহত হ্রদের পদ্মের ছায়া। কবি স্বয়ং এক মৌন রাজপুরী, যিনি পাহারা দেন প্রতি ঘাসে-ঘাসে, কিন্তু ভিতরে যান না। এই দূরত্ব, এই অপেক্ষা, এই ভয়—অলোকরঞ্জনের প্রেম-কবিতার এক ভিন্ন স্তর। এখানে তিনি কেবল রোমান্টিক নন, তিনি স্মৃতির রক্ষক, যিনি জানেন ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শত্রু হল বিস্মৃতি। এই কবিতার ভেতর দিয়ে আমরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের আরেকটি দিক আবিষ্কার করি—প্রেমকে তিনি দেখেছেন এক পবিত্র আমানত হিসেবে, যা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রেমিকের।
এরপর আসে ‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’ (১৯৭৩), ‘গিলোটিনে আলপনা’ (১৯৭৭), ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’ (১৯৮৩), ‘মরমী করাত’ (১৯৯০)। অলোকরঞ্জনের কবিতায় সত্যিকারের বাঁকবদলের সূচনা ‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’ থেকে। যে-বৈশ্বিক চেতনা অলোকরঞ্জনকে সৌরদিগন্তে অভিষিক্ত করেছে তার প্রকৃত সূচনা এই কাব্যগ্রন্থে। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়, তাঁর আগামীকালের চলা যে দুইয়ের মধ্যে ফল্গুসঞ্চারী সামঞ্জস্যকে পাথেয় করেই তার ইঙ্গিত এর প্রথম কবিতাতেই আমরা পেয়ে যাই: ‘তুমি নারী ট্রাক্টর চালিয়ে এলে গমখেত থেকে আঙিনায়/ বীজগম নেবে বলে/ তোমার হাতে দেব বলে সোনারপুরের শাঙন কাজললতা/ যশোরের চিরুনি হাতে দাঁড়িয়ে আছি।’ এই নারী ভারতীয় নারী নয়, জার্মান নারী। ট্যুবিঙ্গেনের কিষানি সে। তার হাতে কথক সোনারপুরের কাজললতা এবং যশোরের চিরুনি তুলে দেওয়ার জন্য অপেক্ষারত। এইভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে মেলানোর কথা আগে কে ভেবেছেন আর!
‘গিলোটিনে আলপনা’ কবির সমকালমনস্কতার সঙ্গে আরেকটি মাত্রা যুক্ত করেছে—তীক্ষ্ণ প্রতিবাদী মানসিকতা। সত্তরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দিনগুলিতে সমপ্রাণ কবি শঙ্খ ঘোষের মতোই তাঁর লেখনী ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। ‘আন্তিগোনে, মঞ্চ: কলকাতা’ কবিতায় তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বাস্তবতাকে প্রবল প্রতিমায় প্রাণস্পর্শী করে তুলেছেন। ‘জ্ঞানপাপ’, ‘নির্ধারণ’ ইত্যাদি কবিতায় রয়েছে নকশাল আন্দোলনের নিরপেক্ষ মূল্যাঙ্কন। একটি আন্দোলনে কতশত সবুজ প্রাণ বলি হলো—এর জন্য একটা গভীর ব্যথা কবির অন্তরে ছিল। সেই ব্যথারই প্লুতস্বর এইসব কবিতা।
এই প্রতিবাদের সঙ্গে মিশে আছে নারী-শরীর, নারী-স্বাধীনতা আর পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক নিরব বিদ্রোহ। ‘বৈদেহী’ কবিতায় তিনি লিখছেন: ‘প্রথম পাপ করার মতো বিবেক এলো মনে,/ চক্ষু বুজে সেই নারীকে নিলাম আলিঙ্গনে।’ এখানে নারী কোনো পতিতা নয়, সে স্বাবলম্বী, সে রহস্যময়ী, সে চুম্বনের বৈশ্বানরে পুরুষকে পুড়িয়ে রেখে চলে যায়। কবি তাকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেন, তাকে জানতে গিয়ে নিজেই অচেনা হয়ে যান। এই কবিতায় অলোকরঞ্জন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, নারীর স্বাধীন সত্তাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ‘এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমন্দিরে ঢুকে যায়’ কবিতার সঙ্গে ‘বৈদেহী’র এই সংযোগ—দুটোই সমাজের কপটতা, অস্পৃশ্যতা, নারীর প্রতি দ্বৈত নৈতিকতার বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ। অলোকরঞ্জন বুঝেছিলেন, নারীর শরীর নিয়ে সমাজের এই বিভাজন, এই শ্রেণিবৈষম্য, জাতপাতের ধুয়া—সবই মানুষের বানানো। ঈশ্বরের সৃষ্টিতে সবাই সমান, অথচ মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যায় সেই নারীর জন্য, যে রাতে পুরুষের শরীর ছুঁয়ে দেয়।
‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’ কাব্যগ্রন্থে দেখি বক্রভাষণে কবির দক্ষতা তুঙ্গস্পর্শী হয়ে উঠেছে। কখনো তাঁর বক্রবাচনের লক্ষ্য হয়েছে ভণ্ড প্রগতিশীলের দল: ‘আর সে-তথাকথিত প্রগতির দালালেরা তার/ সদ্য-ষোড়শীর দেহে রাখল না কাপড়/ যেন কোনো ব্যবধান নেই আর শৃঙ্গার ও খুনে!’ কখনো পিতাকেও বক্রবাচনের লক্ষ করেন— ‘তাঁকে দেখাচ্ছে অবিকল/ পাড়ার এক মাস্তানের মতো।’ এই পর্যায়ে অলোকরঞ্জনের ভাষা আরও স্মার্ট হয়ে উঠেছে। ভাষায় এসেছে তীর্যক চলন। সেই সঙ্গে চোখে পড়ে মাটির পৃথিবীর সঙ্গে আরও বেশি করে নিজের সৃষ্টিকে লগ্ন করার প্রবণতা। এখানেই দেখি তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুধার্ত শিশুর জন্য তাঁর ব্যাকুলতা— ‘সান্ত্বনাময় শিশু এখন আবজে আছে মাকে/ আজকে নেই তো রুটি,/ কাল। আমি ঠিক তোমার জন্যে মুক্তি নিয়ে এসে/ হাসতে হাসতে বন্দিশালায় যাব…’
এই পর্যায়ে এসে অলোকরঞ্জনের কবিতায় এক নতুন টানাপোড়েন দেখা যায়—জীবন আর শিল্পের মধ্যে, বাঁচা আর লেখার মধ্যে। ‘দোটানা’ কবিতায় তিনি লিখছেন: ‘একদল জীবন যাপন করবে/ অন্যেরা গড়বে শিল্প:/ আমি ও দুয়ের মধ্যে যাতায়াত করছি এখন।’ এই কবিতায় কবি স্বীকার করছেন, তাঁর বাঁচার ভিতরে লেগেছে শিল্পের কারুকাজ, আর শিল্পের স্নায়ুতে আদিখ্যেতা করছে জীবন। তিনি শুদ্ধ নন, এ দুয়ের কারুর কাছেই নন। কিন্তু এই অশুদ্ধতাই তাঁর শক্তি—কারণ এখানেই তিনি সৎ। এই আত্মসমালোচনা, এই দ্বিধা, এই দোটানাই অলোকরঞ্জনকে অনন্য করে তোলে। তিনি স্লোগান লেখেননি, তিনি ইমেজের ভেতর দিয়ে সত্যকে উন্মোচন করেছেন।
অলোকরঞ্জনের কবিতার আরেকবার দিকবদল ঘটেছে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরবর্তীকালে, বিশেষত ঊপসাগরীয় যুদ্ধের সময় থেকে। অলোকরঞ্জন বোধহয় একমাত্র ভারতীয় কবি যিনি ঊপসাগরীয় যুদ্ধে মানবতার অপমৃত্যু দেখে শিউরে ওঠেন। এর অভিঘাতে তাঁর জীবন ও কাব্যদর্শনটাই যায় বদলে। চিন্ময় গুহের সঙ্গে এক কথালাপে এই বদলের দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: ‘এইখানে আমি বলব, বার্লিনের দেয়াল থেকে শুরু করে গালফ যুদ্ধ পর্যন্ত ঘটনার আবর্ত আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তার কারণ আমি তাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষী থেকেছি। … মিলেনিয়াম শেষ হওয়ার সময় আমার মনে হলো এইসব কথা আমি যদি এখন না ভাবি, যা ভাবছি তা যদি না বলি, তাহলে আমার অসততা করা হবে কবিতার কাছে।’ এই দায়বদ্ধ মানসিকতার প্রথম প্রকাশ আমরা লক্ষ করি ‘আয়না যখন নিশ্বাস নেয়’, ‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে। এই সকল কাব্যগ্রন্থে বারংবার এসেছে উদ্বাস্তু সমস্যা, শরণার্থীদের কথা, সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরবর্তী সময়ে তৃতীয় বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে কবির আন্তরিক উদ্বেগ প্রভৃতি বিষয়।
এই পর্যায় থেকেই দেখি অলোকরঞ্জনের ঈশ্বরবিশ্বাসের আয়তনটি টলমল হয়ে গেছে। এখন অনেকটাই অনীশ্বর তিনি। ‘ভাবমূর্তি’ কবিতায় স্পষ্টই বলেন: ‘একটু একটু অনীশ্বর হয়েছি/ প্রেতপিশাচের দল ডম্বরু বাজায় শর্বরীতে/ তথাপি যেহেতু কবে যৌবন বাউল লিখেছিলাম/ ঈশ্বরের কথা বলি, ভাবমূর্তিটুকু রেখে দিতে।’ এই স্বীকারোক্তি তাঁর সততার প্রমাণ। তিনি ঈশ্বরকে হারিয়েও মানবতাকে হারাননি। বরং নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন।
এই অনীশ্বরতার বেদনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘পাহাড়চুড়ান্তে এসে’ কবিতায়। এখানে কবি প্রশ্ন করছেন: ‘পাহাড়চুড়ান্তে এই শরীরহীনতা/ মেনে কি নিয়েছ তুমি, ঈশ্বরী আমার?’ এই ঈশ্বরী আর আগের সেই ঈশ্বরী নন—তিনি এখন অনুপস্থিত, তিনি এখন প্রশ্নের মুখে। কবি বলছেন: ‘পুরুষ সহজে যায়, আরেক সোপান/ সানন্দে ডিঙিয়ে আমি চলে যেতে পারি,/ সব পুরুষের বুকে একহংস আছে/ পড়ে-পড়ে একহংস ঘুমোয় ঘুমোয়।’ এই হংস-প্রতীক অলোকরঞ্জনের নিজস্ব—একহংস যা ঘুমায়, তারপর অকস্মাৎ সুনীল শূন্যের গোপন দংশন জেগে ভেসে চলে যায়। কবি পালাতে পারেন, মুক্তি পেতে পারেন, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: ‘তুমি কি সঙ্গে যাবে, ঈশ্বরী আমার?’ শেষে তিনি স্বীকার করেন: ‘আর কাকে সঙ্গে নেবে? আমার প্রাক্তন/ চিঠিগুলি, আমার তরুণ বয়সের/ প্রতিকৃতি?’ এই কবিতায় অলোকরঞ্জনের জীবনের সেই দোটানা স্পষ্ট—একদিকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে স্মৃতির বোঝা। তিনি জানেন, তাঁর ঈশ্বরী কেবল তাঁর নন, তিনি ‘সবার ঈশ্বরী’। এই উপলব্ধিই তাঁকে শেষ পর্যন্ত মানবতাবাদী করে রাখে।
ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কবিতায় অলোকরঞ্জন তুলে আনতে থাকেন প্রতিবাদের স্বর। ‘ড্যামোক্লেসের ছোরা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘সেই যে তুমি একফোঁটা মসলিনে/ বুনতেছিলে দামাস্কাসের গোলাপ/ মাথার উপর তখনো ঝুলছিল/ ড্যামোক্লেসের ছোরা।’ ‘হাওয়া ঘুরে গেলে’ কবিতায় তিনি বক্রভাবে উচ্চারণ করেন: ‘যারা বলেছিল ঈশ্বর মৃত/ এখন তারাই বলছে প্রোথিত/ পুঁথি আর বইগুলি।/ যারা বলেছিল মৃত ঈশ্বর/ ধর্মের ভয়ে খুঁজছে শিকড়/ তাবিজ আর মাদুলি।’
এরপর এসেছে নতুন শতক। আবারও অলোকরঞ্জনের কবিতার জঙ্গম প্রবাহে এসেছে নতুন বাঁক। শরণার্থী, উদ্বাস্তু সমস্যার প্রতি উদ্বেগের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার জন্য উদ্বেগ সংহত হয়েছে তাঁর কবিতায়। তবে আসল পরিবর্তন এসেছে আঙ্গিকে। কবিতার আধুনিকতাবাদী ছাঁচটিকে ভেঙে কবিতার পরিসর বাড়ানোর বিপ্লবী সাধনায় তিনি ব্রতী হয়েছেন। জার্মান ভাষায় একটি শব্দ আছে—Weites Feld। এর অর্থ প্রশস্ত মাঠ বা বিরাট এলাকা। এই এলাকা শিল্পের। অলোকরঞ্জন মনে করতেন, আজকের দিনে কবিতা ইত্যাদি কোনো শিল্পকেই কৌম আয়তনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সবাইকে সবার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে। জার্মান ভাষায় এজন্যই একটি গোটা শব্দ আছে—Gesamtkunstwerk। এর অর্থ সমগ্র শিল্পকর্ম। একটি শিল্পকে অন্য শিল্পশাখার সঙ্গে অন্বিত করে দেখার এষণা এই শব্দের মধ্যে অন্তঃশীল হয়ে আছে। অলোকরঞ্জন একেই বলেছেন ‘সমবায়ী শিল্পের সাধনা’। এই সাধনাই তিনি সচেতনভাবে শেষ দুই দশক ধরে করে গেছেন। ‘নিরীশ্বর পাখিদের উপাসনালয়ে’ কাব্যগ্রন্থে কবিতার মধ্যে বুনে দেন খ্রিষ্টান মিথকথা। সেই মিথকথার কেন্দ্রীয় চরিত্র সেন্ট ফ্রান্সিস। আখ্যানের শেষে ঈগলের তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা নিয়ে আসে: ‘উনি কেন আমাদের/ সবাইকে বোন বলে করলেন এ হেন সম্ভাষণ!/ আমি কি পুরুষ নই?’ এখানে আখ্যানটির বিনির্মাণ ঘটে যায় অনায়াসে। নারীবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে যুগ্মকের সম্ভাবনা যে নিহিত ছিল সেন্ট ফ্রান্সিসের আখ্যানের অবকাঠামোয় তা পূর্বে কে জানত!
অলোকরঞ্জন স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি যে, তাঁর আন্তর্জাতিক ভাবনা শান্তিনিকেতনে পড়াশুনার সূত্রেই পেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন: ‘যখন জার্মানিতে গিয়ে পড়লাম, তখন মনে হল মনের ভিতরের ‘বিশ্বকিশোর কমপ্লেক্স’-এর অভিক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি বাইরে। ব্রেখট অনুবাদ করি বা রিলকে বা সুরদাস, তাঁরা আমার ভেতরের চৈতন্যকে সম্প্রসারিত করেছেন। কোনো সংকীর্ণ দেশ বা জাতি নয়, আমাদের স্বদেশ সংস্কৃতির মূল কাঠামোর সঙ্গে বিশ্বপ্রতিমার কীভাবে যোগসাধন করা যায়, সেটাই ছিল চ্যালেঞ্জ।’ হয়তো বিদেশের সঙ্গে দেশের বন্ধন ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি এত অনুবাদ কর্মে হাত দিয়েছিলেন। কলকাতায় থাকতেই, ১৯৫৭ সালে, তিনি বন্ধু আলোক সরকারের সঙ্গে যুগ্মভাবে ‘ভিনদেশী ফুল’ নামে ফরাসি কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে সম্পাদনা করেছিলেন ‘সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত’ নামে নানা দেশের কবিতার বাংলা অনুবাদ। অনেক পরে জার্মান ভাষার কবিতা অনুবাদ করেছেন ‘প্রেমে পরবাসে’ (১৯৮৩) নামে। অনুবাদ করেছেন হাইনের কবিতাও। আবার বাংলা কবিতাকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন জার্মান পাঠকদের কাছে। এ সবেরই প্রণোদনা এসেছিল দেশ-বিদেশকে মেলানোর ভাবনা থেকে। এর জন্য জার্মান সরকার ১৯৮৫ সালে অলোকরঞ্জনকে সে দেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা পুরস্কার গ্যোয়েটে পদকে সম্মানিত করেছিল।
নিজের দেশের পুরস্কারও কম পাননি অলোকরঞ্জন। কবি হিসেবে তাঁর স্বকীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে সাহিত্য অকাদেমি, তাঁর ‘মরমী করাত’ কাব্যগ্রন্থের জন্য (১৯৯২)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানিত করেছে সুধা বসু পুরস্কারে (১৯৮৩)। এছাড়া পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৫) ও রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৮৭)। তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা যেমন তাঁকে স্বকীয়তা দিয়েছে ও বাড়িয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্য, তেমনই বৈদগ্ধ্য ও বিশ্বমনস্কতা তাঁর কাব্যজগৎকে দিয়েছে ব্যাপ্তি। তাঁর ‘শিল্পিত স্বভাব’ (১৯৬৯), ‘স্থির বিষয়ের দিকে’ (১৯৭৬), ‘ঘূর্ণিস্রোতে সৃজনী সংরাগে’, ‘শেষ কথা কে বলবে’ ইত্যাদি প্রবন্ধগ্রন্থে তাঁর অসীম বৈদগ্ধ্য ও পাণ্ডিত্যের সঙ্গে মিশেছে সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে মৌলিক চিন্তা।
আমি তাঁকে দেখিনি। কিন্তু যখন ‘চৌরঙ্গীর ফুটপাথে’ কবিতাটা পড়ি—’আমার শতাব্দীর কামধেনু/ ঢেলে দিচ্ছে কালো দুধ সীসা-রঙা/ যে খাবে তার মৃত্যু হবে/ যে খাবে না, তার মূর্খতা ভালোবাসি না’—তখন মনে হয়, এই কণ্ঠস্বর আমার কানে বাজছে। যখন ‘বুধুয়ার পাখি’ পড়ি, তখন রিখিয়ার পাহাড়, নীল আকাশ, আলোয় ভরা পথের কলস আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যখন ‘এক উদাসীন পান্থ’ পড়ি, তখন মনে হয় সেই উদাসীন পান্থ আমিও—যে খুঁজছে তার ঈশ্বরীকে, যে জানে না সে কার, যে জানে না তার গন্তব্য কোথায়। তখন আমি অনুভব করি, কবি শরীরে নেই, কিন্তু তাঁর আত্মা ছড়িয়ে আছে শব্দে শব্দে। তিনি হয়তো হাইডেলবার্গের কোনো রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন, আবার রিখিয়ার কোনো পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছেন। তাঁর কবিতা আমার কাছে সেই দুই জগতের সেতু।
কেউ তাঁকে বলেছেন বাঙালির বিটোফেন, কেউ বলেছেন আধুনিক বাউল, তিনি পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি, রবীন্দ্র পুরস্কার, জার্মানির গ্যোটে পুরস্কার— কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মর্ম কজন বুঝেছেন? তিনি নিজে বলতেন, ‘যে মানুষগুলো বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন খেয়ে বেরোচ্ছেন, তাঁদের কি ভুক্তভোগী বলা যায়?’ এই রসবোধ, এই আত্মসমালোচনা তাঁর চরিত্রের অংশ। তিনি সারাজীবন তরুণ ছিলেন। একবার তাঁর আশিতম জন্মদিনে ওয়াইন উপহার দিতে আসা ব্যক্তি তাঁকে দেখে বিশ্বাসই করেনি যে তিনি ষাটের বেশি। অলোকরঞ্জন কিছুতেই বোঝাতে পারেননি। শেষে সেই ব্যক্তি নিজেই ওয়াইন খেয়ে নেয়। এই ঘটনাটি তাঁর চিরযৌবনতার প্রতীক।
তিনি বলেছিলেন: ‘ভগবানের গুপ্তচর, মৃত্যু এসে বাঁধুক ঘর/ ছন্দে আমি কবিতা ছাড়ব না।’ তিনি ছাড়েননি। মৃত্যু এসেছে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর। কিন্তু কবিতা ছাড়েননি। আজ তিনি নেই, তবু তাঁর কবিতা আছে। আর সেই কবিতার ভেতর দিয়েই তিনি আছেন—যৌবনবাউল হয়ে, চিরকালের তরুণ হয়ে, আমাদের সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছেন কোনো এক অলোকরঞ্জনে। তাঁর জীবনটা যদি পরতে পরতে খুলে দেখি, তবে দেখা যাবে—প্রতিটি পরতের নিচে লুকিয়ে আছে এক নতুন অলোকরঞ্জন, যিনি কখনো বাউল, কখনো বিদ্রোহী, কখনো প্রবাসী, কখনো আবার শিকড়ের সন্ধানী। আর সেই সব অলোকরঞ্জন মিলেই তৈরি হয়েছেন এক অসামান্য কবি, যাঁকে আমি দেখিনি, কিন্তু চিনেছি তাঁর কবিতায় কবিতায়, সঙ্গমে জঙ্গমে...














