অমর শিল্পীর অনন্তযাত্রা

কারও কাছে তিনি ‘শিল্পী ভাই’, কারও কাছে ‘নতুন কুঁড়ি’র কারিগর, আবার অনেকের কাছে ‘পাপেটম্যান’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী মঞ্চায়নের নেপথ্য নির্মাতাও তিনি। বহুমাত্রিক সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ এ মানুষটির নাম মুস্তাফা মনোয়ার। যিনি ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম পথিকৃৎ।
গতকাল সোমবার সকালে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দেশের এই কিংবদন্তি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বার্ধক্যের নানা জটিলতার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন। গত কয়েক মাসে একাধিকবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল তাকে।
সবশেষ গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন মুস্তাফা মনোয়ার। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতি হওয়ায় কয়েক দিন আগে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হলেও পরে অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় লাইফসাপোর্টে। সেখান থেকে আর ফেরেননি।
মৃত্যুর পর তার মরদেহ নেওয়া হয় ধানমন্ডির বাসভবনে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, শিল্পী মনিরুজ্জামানসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। রফিকুন নবী বললেন, ‘দেশের সাংস্কৃতিক জগতের সৃজনশীল ব্যক্তিদের কথা যদি বলি, তিনি শ্রেষ্ঠদের একজন। তার মতো এত বড় মাপের মানুষের মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে কঠিন।’
আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে রাখা হবে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। জোহর নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হবে চারুকলা অনুষদে। পরে দাফন করা হবে বনানী কবরস্থানে। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন মুস্তাফা মনোয়ার।
শোকমুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেটশিল্প, নাটক ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে তার মৃত্যু এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। জাতি তার অবদানকে সর্বদা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’
মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্টিকর্ম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরদিন অনুপ্রাণিত করবে, এক শোকবার্তায় বলেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
শিল্পী ভাই ও তার পুতুল সংসার
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ তাকে ডাকত ‘শিল্পী ভাই’ বলে। সেই সম্বোধনই পরে দেশের কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তার অনবদ্য সৃষ্টি ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন; তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি। টেলিভিশনে আজব দেশে অনুষ্ঠানে নিয়মিত প্রদর্শিত হতো মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম নকশাকারও ছিলেন তিনি।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে নানাবাড়িতে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম। তবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা জমিলা খাতুনকে হারান তিনি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন সবার ছোট। বরেণ্য এই শিল্পীর পৈতৃক নিবাস ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে।
১৯৫২ সালে মুস্তাফা মনোয়ার যখন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র, তখনই হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী কিশোর। ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন এঁকেছিলেন। ফলে পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়ে প্রায় এক মাস কারাবন্দি থাকতে হয়েছিল তাকে।
শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পাওয়া এই শিল্পী বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বহু সম্মাননা অর্জন করেন। ১৯৯০ সালে টিভি নাটকের জন্য টেনাশিনাস পদক, ১৯৯২ সালে চারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু শিল্পকলা কেন্দ্র (কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট), চট্টগ্রামের কিডস সম্মাননা পদক এবং ২০০২ সালে চিত্রশিল্প, নাট্যনির্দেশনা ও পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশুকেন্দ্রের বিশেষ সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।




