আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে নানা আয়োজন
মেঘের ডানায় ভর করে বর্ষার দিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা থেকে তোলা- ফোকাস বাংল
আকাশে মেঘের ভেলা, বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ আর দূরে কোথাও বৃষ্টির মৃদু শব্দ— বর্ষা তার আগমনী বার্তা আগেই পৌঁছে দিয়েছে প্রকৃতির দুয়ারে। তবু ঋতুচক্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে কাল, ১ আষাঢ়ে। বাংলা পঞ্জিকার পাতায় শুরু হবে বর্ষা ঋতুর প্রথম দিন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ষা বরণ করে নিতে নেওয়া হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। সামাজিক মাধ্যমেও বর্ষার স্মৃতি, অনুভূতি ও শুভেচ্ছায় মুখর থাকবেন অনেকে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আষাঢ় মানেই এক বিশেষ আবেগের নাম। কখনো প্রেম, কখনো বিরহ, কখনো কৃষকের নতুন স্বপ্ন, আবার কখনো প্রকৃতির নবজাগরণ। তাই আষাঢ়ের প্রথম দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা ও নান্দনিক অনুভবেরও অংশ।
বর্ষার আবহ ধারণ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘এসো শ্যামল সুন্দর, আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।’ অন্যদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার গানে বর্ষার রূপকে ডেকেছেন, ‘আষাঢ়েরই প্রথম দিনে, মেঘের পরে মেঘ জমেছে...’।
নদীমাতৃক বাংলার কৃষিজীবন, লোকসংস্কৃতি, গান, কবিতা ও চিত্রকলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেঘ-বৃষ্টির অগণিত গল্প। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি...’। সেই বাংলার মুখেই আজ আষাঢ়ের প্রথম দিনের সজল হাসি। মেঘের ছায়া, বৃষ্টির সুর আর সবুজের বিস্তারে শুরু হলো বর্ষার নতুন অধ্যায়।
প্রথম প্রভাতে গান, কবিতা ও নৃত্যের আয়োজন
বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৮ বছর ধরে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে ‘বর্ষা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় এবারও আয়োজিত হচ্ছে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। আগামীকাল সোমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশের দক্ষিণ পাশের চত্বরে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে শিল্পী মো. মিনহাজুল হাসান ইমনের রাগসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের শুভ সূচনা হবে।
‘বর্ষা কথন’ পর্বে সভাপতিত্ব করবেন লেখক, গবেষক ও নৃত্যশিল্পী অধ্যাপক ড. নিগার চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা আশরাফুল আলম এবং বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন বর্ষা উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।
উৎসবে একক আবৃত্তি পরিবেশন করবেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি ও মাশকুরে সাত্তার কল্লোল। একক সংগীত পরিবেশন করবেন অনিমা রায়, তানজিলা তমা, নির্ঝর চৌধুরী, ফেরদৌস কাকলি ও রত্না সরকার (রবীন্দ্রসংগীত); ইয়াসমিন মুশতারী, মাহমুদুল হাসান ও সঞ্জয় কবিরাজ (নজরুলসংগীত); আবু বকর সিদ্দিক, এস. এম. মেজবা ও তামান্না নিগার তুলি (লোকসংগীত); এবং শাহীন খান ও মাহবুব রিয়াজ (আধুনিক গান)।
দলীয় নৃত্যে অংশ নেবে নৃত্যম (নৃত্য পরিচালনা : তামান্না রহমান), দিব্য (দীপা খন্দকার), স্পন্দন (অনিক বসু), ধৃতি নর্তনালয় (ওয়ার্দা রিহাব), নৃত্যাক্ষ (সালমা মুন্নী) এবং নন্দ শিল্প একাডেমি। দলীয় সংগীত পরিবেশন করবে পঞ্চভাস্কর, সুরতাল সঙ্গীত একাডেমি, সমস্বর, নির্ঝরনী, সুরবিহার, সীমান্ত খেলাঘর আসর এবং সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে শিশু-কিশোরদের মাঝে প্রতীকীভাবে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হবে।
উদীচীর দুই আয়োজনে বর্ষাবরণ
বর্ষাকে বরণ করে নিতে ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর বর্ষা উৎসবের আয়োজন করে আসছে উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদ। সোমবার ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে হবে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। এ বছরের উৎসবের প্রতিপাদ্য— ‘আষাঢ়ের গর্জনে নবযাত্রার ডাক, বৈষম্য বিনাশে মানুষ জেগে থাক’। উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের সভাপতি অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী বললেন, ‘বর্ষা কেবল প্রকৃতির নয়, মানুষের মনন ও সমাজচেতনারও নবায়নের বার্তা বহন করে। তাই এই উৎসব সকলের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।’
অন্যদিকে সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। ওস্তাদ জাবীর ইমাম খান শাহী রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে পরিবেশিত হবে বর্ষার গান, কবিতা ও নৃত্যের নানা পর্ব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উদীচীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের পাশাপাশি সমবেত সংগীত পরিবেশন করবে উদীচীর উত্তরা ও ডেমরা শাখা। সংগীত পরিবেশন করবেন অনিমা রায়, মাহমুদুল হাসান, আবদুল ওয়াদুদ এবং বুলবুল ইসলাম। লোকগান পরিবেশন করবেন বিমান বিশ্বাস, বিথী ঘোষ, মায়েশা সুলতানা উর্বি, ওয়ার্দা আশরাফ, মীর সাখাওয়াত, হুমায়রা তাসিন, অদ্বয় স্যান্যাল আর্য এবং জাকির হোসেন।
নৃত্য পরিবেশন করবে ফেরদৌস হোসেনের পরিচালনায় ‘বহর’ এবং অনিক বসুর পরিচালনায় ‘স্পন্দন’ নৃত্যদল। আবৃত্তি পরিবেশন করবেন দীপক সুমন, মৌমিতা জান্নাত, একরাম হোসেন এবং সজীব তানভীর। অনুষ্ঠান যৌথভাবে সঞ্চালনা করবেন মৌমিতা জান্নাত, সজীব তানভীর, রুমি দে ও নাজমুল আজাদ।



