ভৈরবীর আয়োজনে ‘ধ্রুপদ’, শাস্ত্রীয় নৃত্যে জমজমাট এক সন্ধ্যা

ছবি: শাদাব শাহরোখ হাই
সাংস্কৃতিক সংগঠন ভৈরবীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো শাস্ত্রীয় নৃত্য উৎসব ‘ধ্রুপদ’। রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে আয়োজিত উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা উপস্থাপন করেন ভরতনাট্যম, মণিপুরী, কথক, ওড়িসি ও কথাকলি নৃত্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা।
ঐতিহ্য, শাস্ত্র, দেহভাষা, সুর ও ভাবপ্রকাশের এক অনন্য সম্মিলনে “ধ্রুপদ” রূপ নেয় এক নান্দনিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। গত সোমবার অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে ছিল দর্শকের উপচেপড়া ভিড়। নৃত্যপ্রেমী দর্শকদের উপস্থিতিতে অডিটোরিয়ামটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এমনকি অনেক দর্শক দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন পুরো অনুষ্ঠান। শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতি দর্শকদের এমন আগ্রহ ও ভালোবাসা অভিভূত করে আয়োজকদেরও।
অনুষ্ঠানে ভৈরবীর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ইলিয়াস নবী ফয়সাল বলেছেন, “শাস্ত্রীয় নৃত্য কেবল একটি শিল্পমাধ্যম নয়; এটি মানুষের ভাব, দর্শন, শরীরী ভাষা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ‘ধ্রুপদ’-এর মাধ্যমে আমরা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করতে চাই, যেখানে নতুন প্রজন্ম শাস্ত্রীয় নৃত্যের গভীরতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় নৃত্যের দর্শক, শিল্পী ও গবেষকদের মধ্যে একটি আন্তঃসংযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ‘ধ্রুপদ’ সেই সাংস্কৃতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন নৃত্যশিল্পী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোমা মুমতাজ, ট্যাগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ আর্টসের রিসোর্স পার্সন ও কথক নৃত্য সম্প্রদায়ের পরিচালক সাজু আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন তামান্না রহমান।
উৎসবের শুরুতেই মঞ্চে পরিবেশিত হয় মণিপুরী শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনন্য ধারা “পুং চোলম”। শিল্পী অর্ণব শর্মা পুং (মৃদঙ্গ) বাদনের সঙ্গে দেহভঙ্গি, ঘূর্ণন ও তালের শক্তিশালী সমন্বয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। নৃত্যরচনা করেন থিংগম ব্রোজেন কুমার সিংহ।
ভরতনাট্যম নৃত্যদল ঊষান পরিবেশন করে “তোড়িয়াম”। আসমাউল হুসনা মাশিয়াত, প্রত্যাশা বসাক, অরিত্রী রহমান বর্ষা এবং সুবহা বিনতে সোবহান সম্মিলিতভাবে এই পরিবেশনায় অংশ নেন। নৃত্য নির্মাণ করেন থাঙ্কুমুনি কুট্টি এবং পুনর্নির্মাণ করেন প্রিয়াংকা সরকার।
কথক নৃত্য পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসে টিম প্রজন্ম। তারা পরিবেশন করে “বন্ধিশ- আয়ো শাবান” এবং “রবি শঙ্কর তারানা”। নিশিগন্ধা দাশ গুপ্তা, হাফসা আলম স্নাতা, যোহানা সূচনা দাস ও আবু ইবনে রাফি প্রাণবন্ত ছন্দ ও সূক্ষ্ম পদচারণার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। নৃত্য নির্মাণ করেন মোহাম্মদ হানিফ।
এরপর নিবেদিতা দাস পরিবেশন করেন ভরতনাট্যমের “বসন্ত তিল্লানা”। নৃত্যরচনা করেন গুরু খগেন্দ্র নাথ বর্মন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে আগত ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’ পরিবেশন করে “মাইবি জাগোই”। নিংথৌজম মিথিলা চনু, নাউশেকপম জয়িতা সিনহা এবং লুকরাম রশনী সিনহা মণিপুরী আধ্যাত্মিক নৃত্যের ঐতিহ্য তুলে ধরেন।
ওড়িসি নৃত্যে তজিম চাকমা পরিবেশন করেন “বসন্ত পল্লবী”। পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের নৃত্য পরিকল্পনায় নির্মিত এই পরিবেশনাটি ছিল রাগ বসন্ত ও একতালি তালের অপূর্ব সমন্বয়।
ভরতনাট্যম নৃত্যে অন্তরা আক্তার পরিবেশন করেন “দেবী শব্দম”। দেবী পার্বতী, কালী, সরস্বতী ও লক্ষ্মীর বিভিন্ন রূপকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই পরিবেশনায় ভাবপ্রকাশ ও ছন্দময় নৃত্যভঙ্গির সমন্বয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে। নৃত্য পরিচালনা করেন রঞ্জিত বাবু।
এরপর কথক নৃত্যশিল্পী মন্দিরা চৌধুরী পরিবেশন করেন “শিবস্তুতি” এবং শুদ্ধ নৃত্য। ত্রিতাল ও ধামার তালের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই পরিবেশনায় শিবতত্ত্বের গাম্ভীর্য ও শক্তির প্রকাশ ঘটে। নৃত্য নির্মাণ করেন ড. সুচরিতা দত্ত ঘাটা।
প্রান্তিক দেব পরিবেশন করেন ভরতনাট্যমের “অম্বা স্তুতি”। রাজরাজেশ্বরী দেবীর বন্দনাভিত্তিক এই পরিবেশনায় ভক্তি, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার এক মেলবন্ধন ফুটে ওঠে। নৃত্য নির্মাণ ও পরিবেশনায় ছিলেন প্রান্তিক দেব নিজেই।
মণিপুরী নৃত্যে মিথিলা চনু পরিবেশন করেন “ব্রহ্মতাল প্রবন্ধ”। শ্রীকৃষ্ণের তাণ্ডবভিত্তিক এই নৃত্যাংশে শক্তিশালী দেহভঙ্গি, তীব্র লয় ও ঐশ্বরিক ভাবপ্রকাশ বিশেষভাবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নৃত্য নির্মাণ করেন গুরু বিপিন সিংহ।
কথাকলি পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন রোমন ইসলাম প্রীতম। তিনি “দুর্যোধন বধ” পদ-এর অংশবিশেষ পরিবেশন করেন। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও শ্রীকৃষ্ণের রৌদ্ররসকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই পরিবেশনায় কথাকলির অভিনয়ভঙ্গি ও রসতাত্ত্বিক গভীরতা দর্শকদের বিমোহিত করে। নৃত্য নির্মাণ করেন গুরু কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট।
ভরতনাট্যম পরিবেশন করেন মারিয়া ফারিহ উপামা। তাঁর পরিবেশনায় ছিল শুদ্ধ নৃত্যভঙ্গি, সুষম দেহরেখা ও নান্দনিক অভিব্যক্তির সুন্দর সমন্বয়।
কথক নৃত্যে সোনিয়া পারভীন পরিবেশন করেন “তারানা”। রাগ বাসন্ত ও ত্রিতালের উপর নির্মিত এই পরিবেশনায় দ্রুত পদচারণা ও ছন্দের গতি বিশেষভাবে দর্শকদের মুগ্ধ করে। নির্মাণ করেন মনিরা পারভীন।
অপর্না নিশি পরিবেশন করেন মণিপুরী নৃত্য “রাধা রূপ বর্ণন”। লাস্যময় এই পরিবেশনায় শ্রীরাধার সৌন্দর্য, কোমলতা ও শৃঙ্গার রস অত্যন্ত সুকুমারভাবে ফুটে ওঠে। নৃত্য নির্মাণ করেন গুরু কলাবতী দেবী।
ওড়িসি নৃত্যে মো. জসিম উদ্দীন পরিবেশন করেন “বসন্ত পল্লবী”। রাগ বসন্ত ও একতালির সমন্বয়ে নির্মিত এই পরিবেশনায় ওড়িসি নৃত্যের শুদ্ধ দেহভাষা ও ছন্দের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। নৃত্য পরিকল্পনা করেন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র।
অনুষ্ঠানের সবশেষ পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন প্রিয়াংকা সরকার। তিনি প্রথমে পরিবেশন করেন “পুষ্পাঞ্জলি”, যা ভরতনাট্যমের একটি ঐতিহ্যবাহী আবাহনমূলক নৃত্য। এরপর তিনি পরিবেশন করেন “কীর্তনাম”, যেখানে ভক্তি, অভিনয় এবং জটিল পদচারণার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
এছাড়াও নৃত্যম নৃত্যশীলন কেন্দ্র পরিবেশন করে মণিপুরী নৃত্য “রাধা অভিসার”। গুরু বিপিন সিংহের নৃত্যরচনায় এবং তামান্না রহমানের নৃত্য পরিচালনায় পরিবেশিত এই নৃত্যে অংশ নেন ফারহানা করিন তন্দ্রা এবং প্রমা বিশ্বাস। শ্রীরাধার প্রেম, অপেক্ষা ও অভিসারের অনুভূতি অত্যন্ত নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত হয় এই পরিবেশনায়।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিবৃন্দ শিল্পীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট, উত্তরীয় ও শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন।







