বন হারালে হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি : জাজং নকরেক

ছবি: আগামীর সময়
‘বন কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থার ধারক। বন হারিয়ে গেলে শুধু গাছই হারায় না, হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, জ্ঞান এবং পৃথিবীকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিও।’ বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রদর্শনী ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনায় এভাবেই নিজের আলোকচিত্রভিত্তিক গবেষণার মূল বক্তব্য তুলে ধরেন আদিবাসী জনগোষ্ঠী গ্র্যান্ট ২০২৫ বিজয়ী আলোকচিত্রী জাজং নকরেক।
আজ রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পান্থপথের দৃকপাঠ ভবনে বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রদর্শনী ২০২৬-এর অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয় ‘আ’বিমা : বন, মানুষ ও অস্তিত্বের গল্প’ শীর্ষক আলোচনা। এতে নিজের আলোকচিত্রভিত্তিক কাজ উপস্থাপন করেন জাজং নকরেক। তিনি বললেন, ‘গারো জনগোষ্ঠী নিজেদের মানদি বলে পরিচয় দেন, যার অর্থ ‘মানুষ’। তাদের বিশ্বাস, মাতৃদেবী বাগুবা বুর্দি-এর গর্ভ থেকেই মানুষ, বন, প্রাণী ও প্রকৃতির সৃষ্টি। তাই বন তাদের কাছে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উৎস।’
তিনি বলেছেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, যাকে মানদিরা আ’বিমা বা ‘মাটির মা’ নামে অভিহিত করেন, এবং মধুপুর শালবন তাদের খাদ্য, কৃষি, ভেষজ চিকিৎসা, আধ্যাত্মিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বন তাদের জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, উৎসব, গান ও মৌখিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এসেছে।’
বন ধ্বংসের প্রভাব তুলে ধরে জাজং নকরেক বললেন, ‘বন উজাড়, একফসলি রাবার বাগান, ভূমি দখল, তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় বন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের কারণে শুধু বনভূমির আয়তনই কমছে না; বিলুপ্তির মুখে পড়ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞানব্যবস্থা, ভাষা, আচার এবং পৃথিবীকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিও।’
তিনি বললেন, ‘এই কাজ কেবল মানদি জনগোষ্ঠীর গল্প নয়; বরং মানুষ, বন ও ভূমির শিকড়ের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবার আহ্বান।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী গ্র্যান্ট কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য দেন দৃকের প্রতিষ্ঠাতা, আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলম এবং গ্র্যান্টটির মেন্টর ও দৃকের জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্রী হাবিবুল হক।
আয়োজকেরা জানান, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রতিযোগিতা (বিপিপিসি) ‘ফটোজার্নালিজম ইন দ্য মার্জিনস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রান্তিক আদিবাসী আলোকচিত্রীদের জন্য ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী গ্র্যান্ট’ চালু করা হয়। এর লক্ষ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান।
টাঙ্গাইলের মধুপুরের বাসিন্দা জাজং নকরেক বিপিপিসির তৃতীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী গ্র্যান্ট বিজয়ী। তার গ্র্যান্ট প্রকল্পের আলোকচিত্রগুলো বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রদর্শনী ২০২৬-এ প্রদর্শিত হচ্ছে। এ বছরের আদিবাসী জনগোষ্ঠী গ্র্যান্ট ২০২৬ অর্জন করেছেন বান্দরবানের আদিবাসী আলোকচিত্রী মং হ্লাই সিং মারমা।
দৃকের উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রদর্শনী ২০২৬-এ পঞ্চম বাংলাদেশ প্রেস ফটো প্রতিযোগিতা থেকে নির্বাচিত ৩২টি আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। আগামী ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।




