বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
পূর্ণিমার আলোয় গানের আসর

ছবি: আগামীর সময়
শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর প্রতিদিনের ক্লান্তির ভেতর থেকেও কিছু সন্ধ্যা আলাদা হয়ে ওঠে। মঙ্গলবার তেমনই এক জ্যোৎস্নাস্নাত সন্ধ্যার সাক্ষী হলো বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দক্ষিণ পাশের ছাদ। খোলা আকাশের নিচে জমে উঠেছিল ‘আলোর ইশকুল’-এর আয়োজনে গানে গানে পূর্ণিমা সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠানে গান শোনান সংগীতশিল্পী মাজলিনা রহমান ও তৌকির আহমেদ। মাজলিনা গেয়ে শোনান ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’। তার কণ্ঠে গানটি যেন সন্ধ্যার আবহের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। দর্শকসারিতে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। কেউ আকাশের দিকে তাকান, কেউ চোখ বন্ধ করে শুনতে থাকেন সুরের মূর্ছনা।
এরপর মাজলিনা রহমান ও তৌকির আহমেদ একে একে পরিবেশন করেন ‘চাঁদ হেরিছে’, ‘আমি কি তোমার মতো এত ভালোবাসতে পারি’ এবং ‘মনে হয় হাজার বছর ধরে দেখিনা তোমায়’। প্রেম, অপেক্ষা আর স্মৃতির রঙে রাঙানো গানগুলো পূর্ণিমার রাতকে আরও আবেগময় করে তোলে।
অন্যদিকে তৌকির আহমেদ তার একক পরিবেশনায় শোনান ‘তুমি ভয় পেয়ো না, আমি চাঁদকে বলেছি আজ রাতে’, ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভাল’ এবং ‘চাই না বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর।’
গান আর জ্যোৎস্নার এই মেলবন্ধনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদটি যেন কিছু সময়ের জন্য নগরজীবনের বাস্তবতা ছাড়িয়ে অন্য এক জগতে রূপ নেয়। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে এই সংগীত আসর।
সংগীতশিল্পী মাজলিনা রহমানের জন্ম ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে। মাত্র ৪ বছর বয়স থেকে গান শেখা শুরু। প্রথম হাতেখড়ি মায়ের কাছে। পরবর্তীতে মানিকগঞ্জ শিশু একাডেমি এবং শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি হন। সেখানে শর্মীষ্ঠা আচার্য্য এবং নিরঞ্জন কুমার মণ্ডলের কাছে তালিম নেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ অজিত সিংহ ও কাওসার আহমেদের কাছে তালিম নেন। সেইসঙ্গে তালিম নিয়েছেন নজরুল সংগীত শিল্পী উস্তাদ ইয়াকুব আলী খান, মাহমুদুল হাসান, ড.পরিতোষ কুমার মন্ডল, মৃদুলা সমদ্দার, আশা সরকারসহ সংগীত ব্যক্তিত্বদের কাছে।
জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে উচ্চাঙ্গসংগীত ও নজরুল সংগীতে একাধিকবার বিভাগীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ থেকে তিনি নজরুল সংগীতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং স্নাতকোত্তর করছেন। সেইসঙ্গে কাজ করছেন বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চ্যানেলে।
তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের নজরুল সংগীত ও আধুনিক গানের একজন তালিকাভুক্ত সংগীত শিল্পী। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, কবি নজরুল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে কাজ করছেন তিনি।
অন্যদিকে তৌকির আহমেদ বাংলাদেশের এক প্রতিশ্রুতিশীল ও বহুমাত্রিক সংগীতশিল্পী, যিনি শুদ্ধ বাংলা সংগীতচর্চায় নিবেদিত। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ছোট চাচা সাইদুর রহমানের কাছে তার গানের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে তিনি গুরু তপন কুমার দে, গুরু বাদল দাস, সুজিত মুস্তাফা, মাহমুদুল হাসান, জহির আলীম, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী এবং আলী এফ. এম. রেজওয়ানসহ একাধিক গুণী সংগীতগুরুর কাছে তালিম গ্রহণ করেন। নজরুল সংগীত, লোকসংগীত, আধুনিক, ভক্তিমূলক ও দেশাত্মবোধক গান—সব ধারাতেই তিনি সমান পারদর্শী। বাংলা সংগীতের শুদ্ধ ও সৃজনশীল ধারাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
সংগীত জীবনে তৌকির আহমেদ একাধিকবার জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি অংশগ্রহণ করেছেন জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ, জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা এবং জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ক্ষুদে গানরাজ, সেরাকণ্ঠ ও ম্যাজিক বাউলিয়ানাতে। জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১৮টি গোল্ড মেডেলসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন।
২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পী’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমানে তিনি প্রথম আলো বন্ধুসভা, পল্লী সম্রাট আব্দুল আলীম ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, রেওয়াজ পারফর্মিং আর্ট, বাংলাদেশ নজরুল সংগীত সংস্থা এবং হাইকমিশন অব ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন।
প্লেব্যাক ও অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয়। ‘ফেরা’ এবং ‘মা বাবার পরিণতি’ টেলিফিল্মে তিনি প্লেব্যাক ও অভিনয় করেছেন। তার কণ্ঠে পরিবেশিত একাধিক মৌলিক ও ক্ল্যাসিক্যাল গান সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট অর্জন করেছেন। বর্তমানে সংগীত বিষয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত আছেন। তৌকির আহমেদ বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী। তরুণ প্রজন্মকে সংগীতে অনুপ্রাণিত করতে তিনি নিয়মিত ওয়ার্কশপ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে চলেছেন।




