‘দোদুল্যমান পৃথ্বীতে নতুন ভিত্তি গড়ার’ প্রত্যয়ে উদীচীর সুকান্ত জন্মশতবর্ষ উদযাপন

ছবি: আগামীর সময়
‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করবো নতুন ভিত্তি’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (একাংশ)। আজ শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এ উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের (একাংশ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম। আলোচনায় অংশ নেন সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ, লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক মামুন সিদ্দিকী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবুল খায়ের। আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন সঙ্গীতা ইমাম।
অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রয়াণের প্রায় আট দশক পর আমরা যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখন সময় বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ধরন বদলেছে; কিন্তু মানুষের কিছু মৌলিক সংকট এখনো আমাদের সামনে রয়ে গেছে। বৈষম্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সামাজিক অবিচার এবং পরিবেশগত সংকট—এসব প্রশ্ন আজও আমাদের সমাজকে নাড়া দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানুষ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানও ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক করে, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমায়। অন্যথায় কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন মানুষের কাঙ্ক্ষিত সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না।’
অমিত রঞ্জন দে আরও বলেন, ‘আর এই জায়গাতেই সুকান্ত আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের জীবনের পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র কিংবা উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তার ঘরে খাবার থাকে, তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকে, তার সন্তান নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে এবং সে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।’
মাহমুদ সেলিম বলেন, ‘আমাদের জীবদ্দশায় আমাদের নানা সংগ্রামে, আন্দোলনে সুকান্ত আমাদের পাশে থেকে হাজার সুকান্ত হয়ে আজও যুদ্ধ করেন তাঁর তীক্ষ্ণ কবিতা আর গানের অস্ত্র নিয়ে। যেখানেই সংগ্রাম-যুদ্ধ, সেখানেই সুকান্ত।’
আলোচনা পর্ব শেষে সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উদীচীর বিভিন্ন শাখার নেতা-কর্মীরা। এ সময় শত প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। পরে সুকান্তের লেখা ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি শপথ হিসেবে সবাইকে পাঠ করান বেলায়েত হোসেন।
এরপর সুকান্তের লেখা ‘অবাক পৃথিবী’ গানের সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে ধৃতি নর্তনালয়। নৃত্য পরিচালনা করেন ওয়ার্দা রিহাব।
অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা। তারা পরিবেশন করেন ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’, ‘হে সাথী আজকে স্বপ্নের দিন গোনা’ এবং ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’ গান তিনটি। এ ছাড়া একক সংগীত পরিবেশন করেন অলক দাশগুপ্ত, জয়া সেনগুপ্তা, শাওন কুমার রায়, সরস্বতী সরকার ও বিজয় বণিক।
উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের শিল্পীরা সম্মেলক আবৃত্তি পরিবেশন করেন। এর শিরোনাম ছিল ‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করবো নতুন ভিত্তি’। পরিকল্পনায় ছিলেন বেলায়েত হোসেন এবং নির্দেশনায় শিখা সেনগুপ্তা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন মো. মাসুদুজ্জামান, শিখা সেনগুপ্তা ও সুমিত পাল।
এ ছাড়া বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে স্রোত আবৃত্তি সংসদ। সাংস্কৃতিক পর্বটি সঞ্চালনা করেন মিতা রায় ও শেখ আনিসুর রহমান।








