নগরীর দুই মঞ্চে উদীচীর বর্ষা বন্দনা
- প্রকৃতি রক্ষার বার্তা, রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবি

ছবি: আগামীর সময়
আষাঢ়ের প্রথম সকালে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে ‘বর্ষা উৎসব' উদযাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (একাংশ)। অন্যদিকে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে বর্ষা বন্দনায় মেতেছিল উদীচীর (একাংশ) ঢাকা মহানগর সংসদ।
বাংলা একাডেমির মঞ্চে আয়োজিত উৎসবে এবার প্রতিপাদ্য ছিল ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’।
লিখিত বক্তব্যে আয়োজকেরা কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে আছে- প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো প্রকল্প বা স্থাপনা গড়া চলবে না। শহরে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসন ধ্বংস করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ভারতের আধিপত্য ও স্বার্থরক্ষাকারী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল করে সুন্দরবন রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের সব নদীর নাব্য ফিরিয়ে এনে নদীভিত্তিক জীবনপ্রবাহ সচল করতে হবে, দখল হওয়া নদী উদ্ধার এবং হাওরের বুকে সব ধরনের ক্ষতিকর বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীতে ভারতের একতরফা বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে উত্তরবঙ্গে সৃষ্ট মরুকরণ রোধে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় এক কোটি জলবায়ু উদ্বাস্তুর বাসস্থান ও জীবিকার জন্য সুচিন্তিত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে ফসলহানি এবং কর্মহীনতার শিকার গ্রামীণ কৃষক, ক্ষেত-মজুর ও শহুরে শ্রমজীবী মানুষের জন্য অবিলম্বে ‘রেশন’ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
পুরো আয়োজন জুড়ে ছিল বর্ষার গান, কবিতা আর নাচের পরিবেশনা। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় শিল্পী জাবীর ইমাম খান শাহীর রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’-এর সুরমূর্ছনার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর কামরুল হাসান ফেরদৌসের পরিচালনায় ‘বহর’ নৃত্যদলের দলীয় নৃত্য পরিবেশিত হয়। দলীয় নৃত্যের পর মঞ্চে আসেন নজরুল সংগীত শিল্পী মাহমুদুল হাসান। তিনি দুটি একক গান গেয়ে শোনান।
দলীর নৃত্য পরিবেশন করে ‘বহর’। সংগীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা। গান শোনান শিল্পী অনিমা রায়, মীর সাখাওয়াত। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন মৌমিতা জান্নাত, সজীব তানভীর, রুমি দে এবং আজাদ অরণ্য।
রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়
বর্ষাকে বরণ করে নিতে ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর বর্ষা উৎসবের আয়োজন করে আসছে উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদ। এই ধারাবাহিকতায় এবার তাদের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘আষাঢ়ের গর্জনে নবযাত্রার ডাক, বৈষম্য বিনাশে মানুষ জেগে থাক’।
সোমবার ভোর সাড়ে ৬টায় রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষা উৎসব। বর্ষার সৌন্দর্য, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক এবং বৈষম্যহীন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়কে ধারণ করে আয়োজিত হয় বর্ষা উৎসব।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদার প্রকৃতি, পরিবেশ ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরে পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণ করেন রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা, মাহমুদ সেলিম, অমিত রঞ্জন দে, বেলায়েত হোসেন এবং কংকন নাগ। বাংলার বর্ষা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনার সম্মিলনে আয়োজিত এই উৎসবে সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও আলোচনা পর্বের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়।
উদ্বোধনী পরিবেশনায় পূর্ণচন্দ্র মন্ডল ও তার দল পরিবেশন করে রাগসঙ্গীত ‘মেঘমল্লার’। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন মহাদেব ঘোষ, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, জয়া সেন গুপ্তা ও শাওন কুমার রায়। একক নৃত্য পরিবেশন করেন তর্পিতা ইসলাম অবধি। দলীয় নৃত্যে অংশগ্রহণ করে ধৃতি নর্তনালয় (পরিচালনা- ওয়ারদা রিহাব) এবং স্পন্দন (পরিচালনা- অনিক বসু)।
সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদ, উদীচী কাফরুল শাখা, উদীচী বাড্ডা শাখা, উদীচী গেন্ডারিয়া শাখা এবং স্বপ্নবীনা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন রেজীনা ওয়ালী লীনা ও সুবর্না আরফিন এবং বৃন্দ আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করে মুক্তধারা, সংস্কৃতি বিকাশ ও চর্চা কেন্দ্র এবং স্রোত আবৃত্তি সংসদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সৈয়দা অনন্যা রহমান ও শিখা সেনগুপ্তা।



